শারদীয় দুর্গোৎসব চলাকালে ও পরবর্তী সময়ে সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনসহ আট দফা দাবি তুলে ধরেছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার প্রতিবাদে আগামী ৪ নভেম্বর শ্যামাপূজায় দীপাবলি উৎসব বর্জনসহ তিন দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে সংগঠনটি।

সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গতকাল শনিবার সারাদেশে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ঘোষিত গণঅনশন ও গণঅবস্থান কর্মসূচি পালনকালে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এ সময় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ঘোষিত শ্যামাপূজায় দীপাবলি উৎসব বর্জন, সন্ধ্যা ৬টা থেকে সোয়া ৬টা পর্যন্ত কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে নিজ নিজ মন্দিরে নীরবতা পালন এবং মন্দির ও মণ্ডপ ফটকে কালো কাপড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাবিরোধী স্লোগান সংবলিত ব্যানার টাঙানোর প্রতিবাদী কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানানো হয়।

এদিন দেশব্যাপী গণঅনশন, গণঅবস্থান ও বিক্ষোভের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি আয়োজিত হয় রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে। সকাল ৬টা থেকে গণঅনশন কর্মসূচি শুরু হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় আলোচনা শেষ করে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা শাহবাগ মোড়ের সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় আশপাশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টায় মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির পানি পান করিয়ে আন্দোলনকারীদের অনশন ভাঙান। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিকের সভাপতিত্বে সমাবেশে গণঅনশন ও গণঅবস্থান কর্মসূচিতে ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ সংগঠনের পক্ষে আট দফা দাবি ও তিন দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি, সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি, গণফোরাম নেতা অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, স্বামীবাগ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) মন্দিরের পুরোহিত মহামন্ত্র কিপ্তন দাশ, জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব পলাশ কান্তি দে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া, ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার, ঢাবি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, মহিলা ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য, শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক অরুণ কুমার প্রমুখ। বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠনের নেতাকর্মীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।

ঐক্য পরিষদের অন্যান্য দাবিতে রয়েছে- সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সব মন্দির ও বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, গৃহহীনদের পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা ও নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে অনূ্যন ২০ লাখ টাকা দেওয়া, বিকল্পে প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের একজনকে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োগ; নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক হামলাকারী ও চক্রান্তকারীদের গ্রেপ্তার করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করা; হামলাকারীদের রোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি ও অবহেলাকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ; সামাজিক গণমাধ্যম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিদ্বেষ ছাড়াও সাম্প্রদায়িক উস্কানিদাতাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে শাস্তি দেওয়া; সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় যেসব প্রতিনিধি এগিয়ে আসেননি তাদেরও চিহ্নিত করে সাংগঠনিক রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ; ২০০১-২০০৬ সংঘটিত সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলি তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশনের সুপারিশ সংবলিত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ ও এর সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দ্রুত বাস্তবায়নসহ জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে দেওয়া অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

এ সময় আট দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে 'চল চল ঢাকায় চল' স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, হামলার পর আমি রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়েছি। সেখানে ক্ষতিগ্রস্তরা বলেছেন, 'আমাদের মা আসবে কবে?' প্রধানমন্ত্রী, তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন। আপনি তাদের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সংহতি জানান।

হাসানুল হক ইনু বলেন, এই হামলা শুধু হিন্দুদের ওপর হামলা নয়, গোটা বাঙালির ওপর হামলা। প্রশাসনের গাফিলতির কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হয়েছে। তাদের একটা অংশ এর জন্য দায়ী।

ফরিদপুর অফিস জানায়, দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে ফরিদপুর প্রেস ক্লাব চত্বরে প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়। ঐক্য পরিষদ জেলা শাখার সভাপতি ভবতোষ বসু রায়ের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন মহানাম সম্প্র্রদায়ের সভাপতি কান্তি বন্ধু ব্রহ্মচারী, ইসকনের সত্য চৈতন্য দাস ব্রহ্মচারী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অরুণ কুমার মণ্ডল, সদর উপজেলা শাখার সভাপতি অশোক রাহূত প্রমুখ।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ে ঐক্য পরিষদের গণঅবস্থান, গণঅনশন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় ঐক্য পরিষদের আট দফা দাবি ও কর্মসূচি তুলে ধরেন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। সভাপতিত্ব করেন ঐক্য পরিষদ নেতা অধ্যাপক রণজিৎ কুমার দে।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় একই কর্মসূচি পালিত হয়।

মন্তব্য করুন