টঙ্গীর হাজির মাজার বস্তিতে গতকাল শনিবার ভোর ৪টার দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সেনাকল্যাণ ভবনের পাশে অবস্থিত ওই বস্তির একটি ঘর থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মশার কয়েল থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছে ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।

খবর পেয়ে টঙ্গী দমকল বাহিনীর চারটি এবং উত্তরা ও কুর্মিটোলার পাঁচটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

বস্তিবাসী অনেকেই জানান, ভোরে বস্তিতে হঠাৎ দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ ঘর কাঠ, বাঁশ ও টিনের তৈরি হওয়ায় আগুনের তীব্রতা বেশি হয়। একই বস্তিতে ২০০৫ সালেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

বাসিন্দা রতন মিয়া বলেন, আগুনের লেলিহান শিখা দেখে আমরা ভয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করি। ৫০ বছর বয়সী দেলোয়ারা বেগমের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে ওঠে বস্তির আকাশ-বাতাস। তিনি শুধু একটি কথাই বলছিলেন- আমার কিছু নাই, আমার সবকিছু শেষ। তার মেয়ে ফাতেমাও কাঁদছিল। মাঝেমধ্যে তারা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন।

বস্তিবাসীর কেউ গৃহকর্মীর কাজ করে, কেউ সিটি করপোরেশনের অধীনে সড়ক ঝাড়ূর কাজ করে; কেউ আবার ভ্যান-রিকশার শ্রমিক। সম্বল বলতে তাদের ঘরে জমানো অল্প কিছু টাকা, রান্নার চাল-ডাল আর ঘরের জিনিসপত্র। ভোরের আগুনে সব হারিয়েছে তারা। শেষ সম্বল হারানোর সঙ্গে সব স্বপ্নও শেষ হয়ে গেছে তাদের।

বস্তির বাসিন্দা ফুলবানু বলেন, স্বামী অটোরিকশা চালক আর আমি পিঠা বিক্রি করি। আগুনে সবকিছুই শেষ হয়ে গেছে। দু'জনের আয়ের সিংহভাগ সন্তানের পড়ালেখার খরচ হিসেবে ব্যয় হতো। তারপরও কিছু টাকা জমানো হতো। হঠাৎ আগুনে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

শহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনে পড়ে মেয়ে সোনালি। আগুন নিভে যাওয়ার পর ধ্বংসস্তূপে নিজের বই-খাতা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটি। তিন কক্ষের ঘরের সবকিছু পুড়ে গেছে। এখন তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

স্থানীয় ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন সরকার জানান, পানির সংকট থাকায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে স্থানীয়রাও আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছেন। প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে একটি করে কম্বল দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সরেজমিন দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বস্তিবাসী। কিছু পাওয়ার আশায় অনেকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই খোঁজাখুঁজি করছে। তবে ঘটনার অনেক সময় পেরিয়ে গেলেও ত্রাণ না পেয়ে ক্ষোভ জানায় তারা।

৯ বছর আগে শেরপুরের নালিতাবাড়ী এলাকা থেকে প্রিয় মানুষের হাত ধরে মাজার বস্তিতে এসে ঘর বাঁধেন শিল্পী বেগম। ভালোবাসার ঘর আলো করে তার কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে দুই সন্তান। সংসারে আর্থিক সংকট থাকলেও ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। নানা স্বপ্ন দিয়ে তৈরি করা সাজানো সংসার নিমিষেই ঝলসে যেতে দেখে অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন শিল্পী। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর শেষ সম্বলটুকুর খোঁজ করতে দেখা যায় তাকে।

এ সময় ভেজা চোখে শিল্পী বলেন, ৯ বছর ধরে তিল তিল করে সংসারটাকে সাজিয়েছি। এখন চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল! আগুন আমার সব কেড়ে নিয়েছে। এখন কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।

প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ইকবাল হাসান জানান, বস্তিতে হাজারখানেক ঘর ছিল। তার মধ্যে পাঁচ শতাধিক পুড়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ঘরগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা সংযুক্ত হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে গেছে। বস্তিতে ঢোকার মতো রাস্তা না থাকায় তাদের গাড়ি ভেতরে ঢুকতে পারেনি। বস্তির বাইরে থেকেই পানি ছিটাতে হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক দিনমণি শর্মা জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, বস্তির এক ঘরে মশার কয়েল থেকে আগুনের সূত্রপাত। আগুনের তাপে বস্তির ঘরে ঘরে থাকা সিলিন্ডারের রাবারের পাইপ গলে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুহূর্তেই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য সাত দিনের খাদ্য কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। তাদের তিন বেলা খাবার দেওয়া হবে। পরে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এবং সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্তরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তাদের পাশে দাঁড়াতে দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান, প্যানেল মেয়র আবদুল আলিমসহ অনেকে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। এদিন দুপুরে জেলা প্রশাসকের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

মন্তব্য করুন