বিএনপি সরকারের আমলে ১৯৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জেলার তিতাস উপজেলার জিয়ারকান্দিতে আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লাকে খুন করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আধিপত্য ও দলীয় কোন্দল ছিল বলে জানা যায়। পরে ৪৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন রিয়াজের মেয়ে জেলা পরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রী পারুল আক্তার। তার অভিযোগ, তৎকালীন সরকারের কাছে বাবা হত্যার বিচার পাননি। ওই সময়ে মামলাটি সিআইডি তদন্ত করলেও পরে হাইকোর্টের নির্দেশে এর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। এভাবে কেটে গেছে প্রায় ৩০ বছর।

২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর সদর দক্ষিণের শামবক্সি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেনকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই কুমিল্লা। এভাবে গত প্রায় ৩০ বছরে আধিপত্য বিস্তার আর রাজনৈতিক কোন্দলে জেলায় প্রাণ গেছে অনেকের। অধিকাংশ ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছে আধুনিক অবৈধ অস্ত্র। সর্বশেষ গত সোমবার সহযোগী হরিপদ দাসসহ নগরীর ১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৈয়দ আহমেদ সোহেল খুন হন। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে জেলায় ঘটেছে প্রায় একশ হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ঘটেছে ৯০টি হত্যার ঘটনা। গত অক্টোবরে সর্বাধিক ১৪টি ও মার্চে ১২টি হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়াও ছোট-বড় অস্ত্র উদ্ধারে গত ১০ মাসে মামলা হয়েছে ৪১টি।

তবে বারবার খুনোখুনি হলেও তদন্তে

ধীরগতির কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারগুলোর মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল, মাদক ব্যবসা, নির্বাচনে জয়-পরাজয়সহ নানা কারণে প্রায়ই এ জেলা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ১৯৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিতাসের জিয়ারকান্দিতে আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা হত্যার ঘটনা। ১৯৯৮ সালে জিয়ারকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান এবং ২০১০ সালে তার ভাই চেয়ারম্যান সফিক খুন হন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর গৌরীপুর বাজারে নিহত হন একই ইউপি চেয়ারম্যান মনির হোসাইন ও তার শ্যালক মহিউদ্দিন। ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল গৌরীপুরে মনির চেয়ারম্যান হত্যা মামলার আসামি যুবলীগ নেতা মোহাম্মদ আলী ও আবু সাইদ নিহত হন। মেঘনায় ২০১৪ সালের ২৫ জুন যুবলীগ নেতা নুর মোহাম্মদ, একই বছরে তিতাসে বিএনপি কর্মী সেন্টু, ২০১৫ সালের ১৫ মে তিতাসের কড়িকান্দিতে ছাত্রলীগ নেতা মাসুম, ২২ মে একই উপজেলায় আওয়ামী লীগ নেতা শাহ আলম এবং ২০১৬ সালের ২৮ মে ইউপি নির্বাচনের দিন বিএনপি নেতাকর্মীরা কুপিয়ে ও টেঁটাবিদ্ধ করে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী কামাল উদ্দিনকে খুন করে। ২০১৮ সালের ২৪ মার্চ তিতাসের আওয়ামী লীগ নেতা হাজি মনির হোসেকে গুলি করে ও ২০২০ সালের ২৪ মে একই উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা নবী হোসেনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।

ভুক্তভোগী পরিবার ও আইনজীবীরা যা বললেন :আওয়ামী লীগ নেতা রিয়াজ উদ্দিন মোল্লার মেয়ে ও মামলার বাদী কুমিল্লা (উত্তর) জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পারুল আক্তার বলেন, বাবাকে হত্যার পর ৪৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করি। সিআইডি মামলাটির তদন্ত করার সময় উচ্চ আদালতের আদেশে তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়।

বিচার পাব না ভেবে এখন আর এ নিয়ে অগ্রসর হতে চাই না। বাবা হত্যার বিচার পাব- সে আশাও ছেড়ে দিয়েছি।

ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে ভুক্তভোগীদের হতাশার ব্যাপারে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুর রহমান গত শুক্রবার সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক মামলায় অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ এজাহার ও চার্জশিট, সময়মতো তদন্ত কর্মকর্তা ও সাক্ষীদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসা, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিলেও পলাতক আসামিদের হাজির না হওয়াসহ বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় অনেক সময় বাদীও প্রভাবিত হয়ে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হন। তাই অনেকেই ন্যায়বিচার পান না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা শাখার সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী আসান টিটু বলেন, সমাজে নৈতিক অবক্ষয় ও রাজনীতির দৃর্বৃত্তায়ন বাড়ছে। এখানে অর্থনৈতিক বৈষম্যও আছে। সামাজিক বন্ধনগুলো ভেঙে যাচ্ছে; মননশীল মানুষ তৈরি হচ্ছে না। তাই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কারও কারও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বিষয়ে জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

মন্তব্য করুন