সড়কপথের মতো না হলেও নিয়মিত বিরতিতে দেশের রেলপথগুলোর বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনা ঘটছে। লেভেল ক্রসিংগুলোতেই ঘটছে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা। অনেক অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি বৈধগুলোও সুরক্ষিত নয়। রেলওয়ে বরাবরই লোকবল সংকটের কথা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে থামছে না দুর্ঘটনা, থামছে না লাশের মিছিল। সর্বশেষ গত শনিবার সকালে চট্টগ্রামের খুলশী থানার ঝাউতলা এলাকায় ডেমু ট্রেনের সঙ্গে সিএনজি অটোরিকশার সংঘর্ষে ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্যসহ তিনজনের মৃত্যু হয়।

রেলওয়ের তথ্যমতে, রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল মিলে সারাদেশে দুই হাজার ৮৫৬ লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৩৬১টিরই অনুমোদন নেই। আবার এক হাজার ৪৯৫টি যে বৈধ ক্রসিং রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ৬৩২টিরই গেটম্যান নেই। গত সাত বছরে কেবল লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্য যানবাহনের ১৩২টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত তিন বছরে বিভিন্ন স্থানে নানা ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনায় হাজারখানেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এ সময়ে যত ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে, তার ৮৯ শতাংশই ঘটে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে। রেলের বৈধ ও অবৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে কমবেশি ৮৪ শতাংশ ক্রসিংয়েই গেটম্যান নেই। অনেক সময় গেটম্যানের অবহেলায়ও দুর্ঘটনা ঘটছে। গতকাল চট্টগ্রামের ঝাউতলায় লেভেল ক্রসিংয়ে যে দুর্ঘটনা ঘটে, সেই লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান ছিলেন। কিন্তু ট্রেন আসার সময়ও খোলা ছিল লেভেল ক্রসিংটি। দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যান মো. আলমগীর নামের সেই গেটম্যান।

লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার জন্য অবশ্য মানুষের অসচেনতাকেই দায়ী করছেন রেলওয়ের মহাপরিচালক ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার। তিনি সমকালকে বলেন, 'বৈধ ক্রসিংগুলোতে আমাদের গেটম্যান রয়েছে। তবে অনেক সময় জোর করে কিংবা কৌশলে রেললাইনে গাড়ি উঠে পড়ে। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে। জনসচেতনতা ছাড়া এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয়।'

তবে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, 'রেলে লাখো টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু দুর্ঘটনা এড়াতে লেভেল ক্রসিংগুলো নিয়ে বাস্তবমুখী কোনো পদক্ষেপ নেই। নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না লোকবলও। ফলে এসব লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব রেলক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান থাকে না, সেগুলোতে ছোট্ট একটি সতর্কীকরণ নোটিশ টাঙিয়ে দায় এড়ায় রেলওয়ে। দুর্ঘটনা ঘটলে তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। মাঝেমধ্যে সংশ্নিষ্ট গেটম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ব্যবস্থা বলতে এতটুকুই। বাস্তবায়ন করা হয় না তদন্ত রিপোর্ট। রেলে হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও লেভেল ক্রসিংয়ের উন্নয়ন, আধুনিকায়ন কিংবা লোকবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয় না। বিষয়টির সঙ্গে মানুষের জীবনের ঝুঁকি জড়িয়ে থাকলেও প্রকল্পে প্রাধান্য পায় না লেভেল ক্রসিং।

গত ৫ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা রেলস্টেশন এলাকায় ট্রেন যখন একটি লেভেল ক্রসিংয়ের কাছাকাছি, ঠিক সে সময় লেভেল ক্রসিংয়ে উঠে যায় বরযাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাস। এ সময় আটকে যায় চাকা। ফলে ট্রেনটি সেই মাইক্রোবাসটি ঠেলে প্রায় আধাকিলোমিটার নিয়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় দুই বরযাত্রীর মৃত্যু ঘটে। গত বছর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বেতকান্দি এলাকায় অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বর-কনেসহ মাইক্রোবাসের ১১ যাত্রী নিহত হন। যশোরের অভয়নগর এলাকায় একটি অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে।

মন্তব্য করুন