ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে যাত্রীবাহী 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চে অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় ওই নৌযানের চার মালিক ও চার মাস্টার-চালককে দায়ী করেছে নাগরিক তদন্ত কমিটি। দায়িত্ব পালনে অবহেলার জন্য দায়ী করা হয়েছে লঞ্চটির ফিটনেস পরীক্ষাকারী শিপ সার্ভেয়ারসহ নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চার কর্মকর্তাকে।

একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ নৌদুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এড়ানোসহ নৌ সেক্টরের সব অনিয়ম দূর করার লক্ষ্যে ওই দুর্ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা ও তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ ২৫ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে নাগরিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে নাগরিক তদন্ত কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন তদন্ত কমিটির প্রধান সমন্বয়ক এবং নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে। তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য সচিব আমিনুর রসুল বাবুলের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন কমিটির আহ্বায়ক ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, বিশেষজ্ঞ সদস্য ও নৌ প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ ও সদস্য জাকির হোসেন। এ সময় নাগরিক তদন্ত কমিটির সদস্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন মাহবুবুল হক, হাজী মোহাম্মদ শহীদ মিয়া, নিখিল ভদ্র, নিশাত মাহমুদ, তৈয়ব আলী, নাজিম উদ্দিন, মোস্তফা কামাল আকন্দ, আব্দুস সোবহান প্রমুখ।

ঢাকা-বরগুনা নৌপথের ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে বরগুনাগামী 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চে গত ২৪ ডিসেম্বর ভোরে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিকা ঘটে। এই দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এখনও বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন। আগুনে দগ্ধদের মধ্যে অনেকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এই দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করতে গত ৪ জানুয়ারি ১৬টি সামাজিক সংগঠন সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিদের নিয়ে ১৯ সদস্যের ওই নাগরিক তদন্ত কমিটি গঠন করে। যা দেশে কোনো নৌদুর্ঘটনা পরবর্তী নাগরিক সমাজের উদ্যোগে গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটি। তিন সপ্তাহের তদন্ত শেষে সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রণয়ন ও প্রকাশ করল নাগরিক তদন্ত কমিটি।

মালিক-মাস্টার-চালক মিলিয়ে মূল দায়ী ১২ জন :নাগরিক তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ইঞ্জিন প্রতিস্থাপন এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে লঞ্চটির চার মালিক হামজালাল শেখ, শামীম আহম্মেদ, রাসেল আহাম্মেদ ও ফেরদৌস হাসান রাব্বি নতুন মাস্টার ও চালক নিয়োগ করে প্রচলিত আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেছেন।

এতে বলা হয়, দুর্ঘটনার দিন ২৩ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে ছেড়ে রাতে চাঁদপুর পৌঁছানোর পর লঞ্চটির ইঞ্জিনে কয়েকবার সমস্যা দেখা দিলেও তা আমলে না নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে চালিয়ে নিয়ে গুরুতর অপরাধ করেছেন লঞ্চের দুই মাস্টার রিয়াজ সিকদার ও খলিলুর রহমান। এ ছাড়া বরিশাল থেকে ঝালকাঠি যাওয়ার পথে সুগন্ধা নদীতে লঞ্চটিতে অগ্নিকাে র মাত্রা বাড়তে থাকলেও আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে ও কাউকে কিছু না বলে দুই চালক মাসুম বিল্লাহ ও আবুল কালাম নেমে যান। এসব কারণে লঞ্চটির এই চার মালিক ও চার মাস্টার-চালক চরম দায়িত্বহীন কাজ করেছেন। এ কারণে অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

ওই দুর্ঘটনার জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএর চার কর্মকর্তার দায়ভারকে চিহ্নিত করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অবকাঠামো ও কারিগরি বিষয়ে সার্বিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চলাচলের যোগ্য মর্মে মতামত দেওয়ায় এবং দীর্ঘদিন বন্ধের পর ফের চলাচলের সময় লঞ্চটি পরীক্ষা না করায় নৌ অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্ট শিপ সার্ভেয়ার (প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক) মাহবুবুর রশীদ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ফের চালু হওয়া লঞ্চটিতে ইঞ্জিন পরিবর্তনের বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করে এবং ২৩ ডিসেম্বর নৌযানটিকে সদরঘাট টার্মিনাল ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়ে বিআইডব্লিউটিএর নৌনিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম পরিচালক জয়নাল আবেদীন কর্তব্যে অবহেলা করেছেন। এ ছাড়া ৪২০ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন লঞ্চে আট শতাধিক যাত্রী বহন করার পরও মাত্র ৩১০ জন উল্লেখ ও ভয়েজ ডিক্লারেশন গ্রহণ করে সদরঘাটে দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিএর পরিবহন পরিদর্শক দীনেশ দাসও দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।

২৫ দফা সুপারিশ :তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখিত ২৫ দফা সুপারিশে 'এমভি অভিযান-১০' লঞ্চ ট্র্যাজেডির জন্য শুধু মালিক, মাস্টার ও ড্রাইভারের শাস্তি নয়; দায়ী সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে সুপারিশ করা হয়েছে।

সুপারিশের মধ্যে দুর্ঘটনায় নিহত পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণের আইন প্রণয়নসহ টাকার পরিমাণ নির্ধারণ ও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা আদায়; প্রত্যেক যাত্রীবাহী নৌযানে আনসার/সিকিউরিটি থাকা বাধ্যতামূলক করা; যাত্রীবাহী লঞ্চের ইঞ্জিনকক্ষ, প্রবেশপথ ও মাস্টার ব্রিজসহ স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক সিসি ক্যামেরা স্থাপন উল্লেখযোগ্য।

মন্তব্য করুন