বাল্যবিয়েকে লাল কার্ড

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

মোছা. ইতি খাতুন

বাল্যবিয়ে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি মারাত্মক ভাইরাসের নাম। বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ও পবিত্র বন্ধন বা বৈধ চুক্তি। আবার অন্যভাবে বলা যায়, যার মাধ্যমে দু'জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তবে বাল্যবিয়ে দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ। আমাদের যাপিত জীবনে আধুনিকতা ও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও বাল্যবিয়ের প্রবণতা পুরোপুরি আজও কমেনি। বরং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাড়ছে বাল্যবিয়ে, যা গ্রামগণ্ডি পেরিয়ে সারাদেশে ব্যাধির মতো ছড়াচ্ছে। বাল্যবিয়ে শুধু দরিদ্র, অল্প শিক্ষিত পরিবারেই ঘটছে তা নয়, অনেক শিক্ষিত পরিবারেও ঘটছে হরদম। বাবা-মার অসচেতনতামূলক দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার বাসনা এই বাল্যবিয়ের কারণে ধ্বংস হয় একটি মন, একটি পরিবার, একটি সমাজ, সর্বোপরি একটি রাষ্ট্র। আর বর্তমান পৃথিবী হারাচ্ছে আগামীর পৃথিবীকে এবং দেশ হারাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশ গড়ার হাতিয়ারগুলো। এককথায় বলা যায়, বাল্যবিয়েতে পুড়ছে দেশের ভবিষ্যৎ।

বাল্যবিয়ে মানেই অন্ধকারে আবদ্ধ হলো যেন তাদের জীবন। এর শিকার ছেলেমেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদনের মতো মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, যা তাকে সারাজীবনের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিইডিএসের ২০১৭ সালের জরিপে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে বাল্যবিয়ের সংখ্যা ৪৭ শতাংশ (১৮ বছরের নিচে); অন্যদিকে (১৫ বছরের নিচে) বিয়ের সংখ্যা ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ। তবে আশার খবর, বাল্যবিয়ে অনেকাংশেই রদ করা গেছে। বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে সমাজ আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। এমনকি এখন বাল্যবিয়ের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, এমন অল্প বয়সী মেয়ে নিজের বিয়ে নিজেই ঠেকিয়ে দিচ্ছে, সমাজে এর দৃষ্টান্তও তৈরি হয়েছে। তারপরও এই ব্যাধি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। জরিপ অনুযায়ী বাল্যবিয়েপ্রবণ ১০ জেলা হচ্ছে- বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, নাটোর, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, জামালপুর, কুষ্টিয়া ও খুলনা। বাল্যবিয়ের বিভিন্ন কারণ লক্ষ্য করা যায়। প্রধান কারণ দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তার অভাব, যৌন নির্যাতন, যৌতুক প্রথা, ইভ টিজিং, অশিক্ষা, অসচেতনতা, অবহেলা, এলাকা, পারিবারিক ভাঙন, ও অবক্ষয়, প্রশাসনের ব্যর্থতা ইত্যাদি।

বাল্যবিয়ের পরিমাণ না কমালে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দেওয়া ও নবজাতকের বিভিন্ন রোগ হওয়ার আশঙ্কা, অপরিকল্পিত স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে। বাল্যবিয়ে নির্মূল করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। বাল্যবিয়ের অন্যতম কারণগুলো চিহ্নিত করে এবং বাবা-মার সদিচ্ছাই পারে বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে। শুধু তাই নয়, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের মাঝে বাল্যবিয়ের কুফল সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া, গণমাধ্যম, পত্রপত্রিকায় আন্দোলন গড়ে তোলা, বাল্যবিয়ে বন্ধে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। বাল্যবিয়ে রোধে যুবকদের নেতৃত্বে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, প্রশাসন মাইকের মাধ্যমে প্রতিটি ইউনিয়ন এবং গ্রামে বাল্যবিয়ের শাস্তি কী হতে পারে, তা যদি প্রচার করত, তাহলে অনেকটা রোধ করা সম্ভব হতো। বাবা-মার পাশাপাশি বাল্যবিয়ে রোধে কাজিরা যদি টাকার কাছে হার না মেনে শপথ নিতেন, তাহলে বাল্যবিয়ে নির্মূল করা সম্ভব হতো। অবশেষে আমি অনুরোধ করি, সব বাবা-মা আসুন, আমরা সবাই বাল্যবিয়েকে লাল কার্ড দিই, আমাদের দেশের সরকার, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংগঠন আপসহীনভাবে বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, আমরা তাদের সঙ্গে শামিল হই এবং বলি- আমার মেয়ের বিয়ে আঠারো বছরের আগে নয়, আঠারো বছর পরে হলে ভালো হয়।

শিক্ষার্থী, লুৎফর রহমান বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সোনাতলা, বগুড়া