কোটা, কৃষক ও কর্মসংস্থান

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সাইদুর রহমান

দেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের কারণে কোটার আবির্ভাব ঘটেছে। তবে এই কোটার দাপট সরকারি চাকরিতেই বেশি। কোটা নামের এই অসম বৈষম্যটি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকবে এটা এখন রাষ্ট্র ও সরকারকে ভাবা উচিত। কোটা পদ্ধতিটি আসলে চালু করা হয় পিছিয়ে থাকা কোনো জেলা অথবা কোনো জনগোষ্ঠীকে সমতায় নিয়ে আসার জন্য। সমতা হয়ে গেলে কোটার মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। এটা যুগের পর যুগ চলতে পারে না। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার এখন সময়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। একটা অসম নীতিমালা রাষ্ট্র দীর্ঘদিন বহন করতে পারে না এবং রাষ্ট্রের জন্য হিতকর হবে না।

কোটা পদ্ধতি বিশ্বের সব দেশেই আছে। কোনো দেশেই ১৫ শতাংশ বেশি কোটা নেই। তাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোটা সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু আমাদের মতো ঞড় নব পড়হঃরহঁব প্রক্রিয়া কোনো দেশেই নেই। মেধার মূল্যায়নে যদি রাষ্ট্র বা সরকার ব্যর্থ হয়, তাহলে সময়ের টানে মেধাশূন্য হবে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান। একটা জাতির মেধাবী জনগোষ্ঠী হলো রাষ্ট্রের ভারহীন অমূল্য সম্পদ। আমাদের দেশে দিন দিন শিক্ষার মানের কী উন্নতি হচ্ছে- পরীক্ষার সময়েই তা দেখা যায়। কিন্তু দিন দিন শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা স্বীকার্য। কোটা সংস্কার বা বাতিলের দাবি অনেক আগের দাবি। বর্তমান সময়ে আর হার মানতে চায় না অথবা ন্যায্য অধিকারটা বুঝে নিতে চায় শিক্ষিত বেকাররা। রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক নীতির জন্য রাষ্ট্রের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মেধার অপমৃত্যু হতে পারে না।

রাষ্ট্র বা সরকার সমাজের প্রতিটি নাগরিককে সমান চোখে দেখবে এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে ব্যতিক্রম শব্দটা রাখার পক্ষে আমি। অনগ্রসর কোনো জাতিগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোটা সুবিধা দেওয়ার পক্ষে আমি। কিন্তু আমাদের দেশের কোটার অবস্থা গলায় গলায় ভরা। অথচ এ দেশে সবচেয়ে সংখ্যায় বেশি এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠী কৃষকদের সন্তানের জন্য কোনো কোটা নেই। আবার বলি, কৃষকরা দেশের চালিকাশক্তি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের মাধ্যমে কৃষকের সন্তানের জন্য কোটা চাই।

নিয়োগ পরীক্ষায় ৮০ পেয়েও কোটাবিহীন পরীক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হতে পারে না; কিন্তু কোটা সুবিধার জন্য ৫০ পেয়েও উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। শুধু চাকরিতে নয়, স্কুল-কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রেও কোটা নামক অসম বৈষম্য সমন্বয় করা উচিত। ৫৬ শতাংশ যদি কোটার মাধ্যমে নিয়োগ পায় অন্যরা কোথায় যাবে?

দেশে যেমন উচ্চশিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি উচ্চহারে বেকারত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তির জরিপে দেখা গেছে, ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার লোক কর্মক্ষম কিন্তু কর্মহীন। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৮০ হাজার। প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার বেকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। জরিপে বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি (৪৭%)। তাদের মতে, বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন হচ্ছে না। ফলে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। জিডিপির সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিরাট ফারাক। তাই কোটা সংস্কারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন অতি জরুরি।

সামনে একাদশ নির্বাচন। নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা একটা ভূমিকা রাখে। আগামী সংসদ নির্বাচনে দুই কোটি ৩৫ লাখের বেশি তরুণ ভোটার ভোট দেবে। সুতরাং ভোটের রাজনীতিতে কোটা সংস্কার একটা বড় ইস্যু হতে পারে। জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশকে আজ বিশ্ববাসী উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেলেও কর্মসংস্থানের কচ্ছপগতি। কর্মসংস্থান আর কোটা সংস্কার দুটি একে অপরের পরিপূরক। জিডিপি আর উন্নয়নকে আরও টেকসই করতে হলে উচ্চ শিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থান দিতে হবে।

সমাজকর্মী