প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ হয়, অনেক বাংলাদেশির সাগর-মরুভূমি-অরণ্য পাড়ি দিয়ে-টপকে-ডিঙিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় যাওয়ার জন্য মর্মন্তুদ নিরন্তর চেষ্টা-সংগ্রামের করুণ মর্মস্পর্শী ঘটনা-দুর্ঘটনা। হ্যাঁ, সবাই যেন পালাতে চায়! পথহারা তারুণ্য তাই সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দেয় কিংবা গভীর সমুদ্রে ডুবে মরে। আবার গহিন অরণ্যে পথ হারায় অথবা তপ্ত মরুভূমিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তবু ফিরে তাকায় না পেছনে।

প্রায় চার কোটি বেকারের এই দেশ থেকে যে বেকার সে যেতেই পারে কাজের আশায়, ভবিষ্যৎ সুখের আশায়। কিন্তু যার অভাব নেই সে-ও তো অস্থির হয়ে উঠেছে। পারলে এখনই পালায় শুধু নিজের জন্য, নিজেরই স্বার্থে! ক'জন আছেন প্রিয় এই বাংলাদেশে, বুকে হাত দিয়ে যারা বলতে পারবেন, সুযোগ পেলেও তারা বিদেশে যাবেন না?

কিন্তু ছিঁড়ে-খামচে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে তো বাঁচে না জীবনের অর্থ। বৈষম্য জন্ম দেয় অন্ধকারের। বৈষম্যই আমাদের আদি সংকট। দূর করতে হবে এ সংকট। আমরা হতাশ হবো কেন? আমাদের প্রাণের শিকড় তো কাদামাটির গভীরে গাঁথা। আমরা পৌঁছে যাব আসল জায়গায়, ভিড়ের মাঝে আর নিঃসঙ্গ হয়ে থাকব না। যদিও জানি, আমাদের অনেক স্বপ্ন-আশা মরে যাচ্ছে, অন্ধকার জমে উঠছে অবিশ্বাসের। আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে সব স্বপ্টম্ন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতাই তো সব নয় ইতিহাসে। হ্যাঁ, ইতিহাসে তো পিছু হটা নেই, শুধু এগিয়ে চলা জীবনের মহাসড়ক ধরে। থামা যাবে না। হাল ছাড়াটাও বোকামি। চলতে হবে। নামতে হবে পথে। পথে নামলেই পথ চেনা যায়। আমরা আমাদের ভাষায় কথা বলব, নিজেদের মানুষের মধ্য দিয়ে কথা বলব।

আমরা উগ্র রক্ষণশীলদের সন্ধান করব না, অতি আধুনিকদেরও নয়; কেননা এই দুই দলের রয়েছে দুই রকমের বিচ্যুতি। এক দল সংকীর্ণমনা, অন্য দল অনুকরণপ্রিয়। উভয়েই কমবেশি বাতিকগ্রস্ত, মাত্রাজ্ঞানহীন। আসলে এ পথ এবং ও পথ নয়, আমাদের সত্যিকার সাধনা হচ্ছে অন্য পথের। যে পথে সংকীর্ণতা ও অতি উন্মুক্ততার দীনতা আর নির্বুদ্ধিতার জঞ্জাল সাফ করা হয়ে গেছে। যে পথ ইঙ্গিত দিচ্ছে সৃষ্টি সৃজনশীলতার। আমরা সেই পথ ধরব। বাংলাদেশকে যেমন, আমাদেরও তেমনি বাঁচাবে এমন প্রত্যয়, সচেতনতা, সংকল্প। স্থিতি মানে মৃত্যু, গতি মানে জীবন। আর জীবন হচ্ছে দৃশ্যমান সংগ্রাম।

আমরা যেন ভুলে না যাই, যে জীবন একবার পালিয়ে যায়, সে আর ফিরে না! তবে মূল যে শত্রু- বৈষম্য তা হটাতেই হবে। বৈষম্যহীন সমাজ বাড়ার প্রত্যয় হতে হবে প্রত্যয়ী।

জেলখানা রোড, ময়মনসিংহ

বিষয় : বৈষম্যহীন সমাজ

মন্তব্য করুন