৫ জুলাই সমকালের সম্পাদকীয় পাতায় অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খানের 'লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট, অর্জনই চ্যালেঞ্জ' শিরোনামে প্রকাশিত লেখাটির বক্তব্যের সঙ্গে অনেকাংশে একমত পোষণ করলেও তার লেখায় কিছু বিষয় অস্পষ্ট রয়ে গেছে। তিনি করোনার ফের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের বিষয়ে যেভাবে আলোকপাত করেছেন, সেভাবে বিস্তার রোধে কিংবা সংক্রমণ গণ্ডিবদ্ধ করতে সরকার ও জনগণের মধ্যে সম্পৃক্ততার বিষয়ে জোর দেননি। আমরা জানি, কোনো বড় অর্জনই সম্ভব নয় জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া। বাস্তবতা হচ্ছে, সরকার বিধিনিষেধ জারি করে মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের জন্য কঠোরতা দেখিয়েই এত বড় কর্মপরিকল্পনা সফল করতে চাচ্ছে। মানুষের খাদ্যের সংস্থান না করে সরকার মানুষকে ঘরে থাকতে বাধ্য করতে পারবে কি? আমরা দেখছি, মানুষ এই বিষয়টিই তুলে ধরছে।

আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার দৈন্য করোনা-দুর্যোগে ফের স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বৃহদাংশ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় কাজে লাগাতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমে প্রায় নিত্যই উঠে আসছে স্বাস্থ্য খাতের একের পর এক অদক্ষতা, সমন্বয়হীনতা, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাসহ নানা রকম উপসর্গ। করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য খাতের বিবর্ণদশা জনগুরুত্বপূর্ণ এ খাতটির সার্বিক অব্যবস্থা তুলে ধরার পাশাপাশি এ প্রশ্ন সামনে দাঁড় করিয়েছে- তাদের পক্ষে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা কীভাবে সম্ভব? এতদিনেও তারা প্রয়োজনের নিরিখে আইসিইউ স্থাপনসহ অনেক কিছুই করতে পারেনি। পারেনি জরুরি স্বাস্থ্যসামগ্রী হাতে থাকা সত্ত্বে এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে। অনিয়ম-দুর্নীতি-অস্বচ্ছতার কাদাজলে খাতটি ডুবে আছে। এর মাশুল গুনতে হচ্ছে মানুষকে। অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান এ বিষয়গুলো তার লেখায় আরও জোরালোভাবে তুলে আনলে মানুষের কল্যাণ হতো।

করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার পেছনে মানুষের দায় যেমন কম নয়, তেমনি সরকারি অব্যবস্থাপনাও কম দায়ী নয়। সরকার চিকিৎসাসেবার পথ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মসৃণ করতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ ব্যাপারে আন্তরিক প্রয়াসের কোনো ঘাটতি নেই তা সত্য; কিন্তু সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এ ক্ষেত্রে এরই মধ্যে অনেক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা জানি না, জাতীয় কমিটি ও বিএমআরসি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের টিকা ট্রায়ালের অনুমোদন দিলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি! সময়মতো তা নেওয়া গেলে আমাদের পক্ষে টিকার সংকট মোকাবিলায় তা হতো যথেষ্ট সহায়ক। এ রকম আরও অনেক বিষয়ই রয়েছে, যেগুলো একেবারে মোটা দাগে বলতে গেলে স্বাস্থ্য খাতের অদক্ষতা-ব্যর্থতা প্রতীয়মান হয়। অধ্যাপক খান এ বিষয়গুলো নিয়ে তেমন আলোচনা করেননি।

চলমান লকডাউনের কার্যকারিতা নিয়ে সংগতই প্রশ্ন উঠেছে। দফায় দফায় করোনা সংক্রমণ বিপন্ন-বিপর্যস্তদের তালিকা দীর্ঘ করেছে। নানা ক্ষেত্রে লেগেছে এর বিরূপ অভিঘাত। অথচ করোনার সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে লকডাউনের বিকল্প নেই। এই কর্মপরিকল্পনা সফল করতে অবশ্যই সর্বাগ্রে মানুষের খাদ্য সহায়তা বাড়াতে হবে, এর পরিধি বিস্তৃত করতে হবে। প্রকৃত ভুক্তভোগীদের হাতে যাতে সহায়তা পৌঁছে, তা নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ। এসব ক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা প্রীতিকর নয়। ডা. কামরুল হাসান খান ঠিকই বলেছেন, লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট কিন্তু অর্জনই চ্যালেঞ্জ। অর্জনের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা জিইয়ে আছে, সেসবের নিরসন না করে চ্যালেঞ্জ-জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা দুরাশারই নামান্তর।

চলমান লকডাউন ফলপ্রসূ করতে হলে কঠোর হতেই হবে। কিন্তু কোনোভাবেই নিষ্ঠুর হওয়া যাবে না। মানুষকে খাদ্যসহ অন্য সব সহায়তা দিয়ে, ব্যবস্থা উন্নত করে, অনিয়ম-দুর্নীতি-অদক্ষতা-অদূরদর্শিতার নিরসন করে আমাদের হাঁটতে হবে লক্ষ্য অর্জনের পথে। একই সঙ্গে মানুষকে বুঝতে হবে, জীবন যদি বিপন্ন হয় তাহলে জীবিকার চিন্তা একেবারেই অর্থহীন। জনগণকে সম্পৃক্ত করার জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বিত্তবানদের সহায়তার হাত বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। অতীতে বিত্তবানরা যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, এবার তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। সরকারকে এ লক্ষ্যে কাজ করা দরকার।

সংবাদকর্মী

মন্তব্য করুন