বাংলাদেশের গ্রামীণ বর্ধিষুষ্ণ পরিবার থেকে শুরু করে ক্রমপ্রসারমান নগর জীবনের পারিবারিক আবাসস্থল, মেস এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডরমিটরি প্রভৃতি গৃহকর্মীদের কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র। তবে রাজধানী ঢাকাসহ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে এবং শিল্প-বাণিজ্যের দ্রুত বিকাশের অনুষঙ্গ হিসেবে গড়ে ওঠা শহরে বসবাসরত নাগরিকদের চাহিদা ও অধিকতর আর্থিক সুবিধা বিবেচনায় প্রান্তিক জনপদের দরিদ্র পরিবার প্রধানত নারী গৃহকর্মী যাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কিশোরী বা শিশুর গ্রাম থেকে শহরে এসে গৃহকর্মে নিয়োজিত হওয়ার প্রবণতা চলমান।

শিক্ষা উপবৃত্তি এবং অবৈতনিক নারীশিক্ষার সরকারি কর্মসূচির কারণে শিশুদের গৃহকর্মী হিসেবে কাজে নিয়োজিত হওয়ার প্রবণতা সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেলেও দারিদ্র্যপীড়িত বিশেষ বিশেষ এলাকা থেকে শিশুদের গৃহকর্মে নিয়োজিত হওয়ার লক্ষ্যে শহরে আসার প্রবণতা অব্যাহত। অন্যদিকে সাধারণত নগরবাসী মানুষের গৃহের সার্বিক নিরাপত্তা এবং গৃহকর্তা ও গৃহের সদস্যদের প্রতি ঈপ্সিত আনুগত্য বিবেচনায় নারী গৃহকর্মীদের অধিকতর সুবিধাজনক বিবেচনা করার ফলে সার্বক্ষণিক গৃহকর্মী হিসেবে নারী গৃহকর্মী বিশেষত কিশোরী বা শিশু গৃহকর্মী নিয়োগের প্রতি অগ্রাধিকার প্রদানের প্রবণতাও লক্ষণীয়।

আনুগত্য প্রাপ্তির এ মানসিকতার মধ্যে বিকৃতিও লক্ষ্য করা যায়, যা গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত। নির্যাতনের ফলে মৃত্যু, আত্মহত্যার মতো কোনো কোনো ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে সংবেদনশীল মানবসমাজকে ভীষণভাবে বেদনাবিদ্ধ করে। দেশের আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় সরকার গৃহকর্মীদের জন্য পর্যায়ক্রমে আইনি কাঠামো তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ প্রেক্ষাপটে গৃহকর্মে নিযুক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণার্থে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

সংবিধানের ২০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কর্মক্ষম প্রতিটি নাগরিকের জন্য কর্মের অধিকার হচ্ছে তার অধিকার, কর্তব্য এবং মর্যাদার বিষয়। এ ছাড়া শ্রমিকের প্রাপ্য পরিশোধের মূলনীতি হলো- 'শ্রমিকের সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মসম্পাদন এবং সম্পাদিত কাজ অনুযায়ী শ্রমের মূল্য পরিশোধ।' অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের আশ্রয় লাভে সমঅধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩৪-এ সব ধরনের জবরদস্তি শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার অনুচ্ছেদ-১ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে ধর্ম, গোত্র, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা, রাজনৈতিক বা ভিন্নমত, জাতীয় অথবা সামাজিক উৎস, সম্পদ, জন্ম বা অন্যান্য স্ট্যাটাস নিরপেক্ষভাবে সমান।

কোনোক্রমেই গৃহকর্মীর প্রতি অশালীন আচরণ অথবা দৈহিক আঘাত অথবা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। নিয়োগকারী, তার পরিবারের সদস্য বা আগত অতিথিদের দ্বারা কোনো গৃহকর্মী কোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অশ্নীল আচরণ বা শারীরিক আঘাত অথবা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হলে দেশের প্রচলিত আইনানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিতে কর্মরত
arafatrahman373@gmail.com

মন্তব্য করুন