জীবন সবার কাছে তার মতো করে নিজস্ব ধ্যান-ধারণার বিষয়। যে সীমাহীন অনুভব পুঁজি করে আমরা আমাদের অস্তিত্বকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই, সেই অনুভূতি জানে তার পথচলায় কত কিছু সে পেছনে ফেলে আসে। গভীর অন্তরাত্মা কতবার অবিশুদ্ধ হয়; কত নিষিদ্ধ জিনিসকে মনে ধরে সে হিসাব যদি কোনো যন্ত্র ধারণ করত তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায়, কেউ আয়নার সামনে দাঁড়াত না। পৃথিবীর কোনোকিছুই যে তার নিজের খেয়ালে নেয় না, সেও দিনশেষে জানে তার আশপাশে কত কিছু তাকে খেয়াল করে চলতে হয়। যে নিজেকে খুব একা ভাবে নতুবা একাকিত্বে ডুবে থেকে সবকিছু থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে চায়, সে হয়তো এটা ভুলেই যায়- তার একাকিত্বের প্রতিটি মুহূর্তে কেউ না কেউ ঢুকে যাচ্ছে যখন তখন! কে এমন মহাবীর জন্ম নিয়েছে, যে স্মৃতি নামক অদৃশ্য শক্তিকে আড়াল করে পথ চলে? একাকিত্ব আসলে একটা নেশা, যে নেশায় আপনি-আমি ডুবে থাকি শুধু কিছুটা মুক্তির জন্য। কিন্তু তাতে কি সফল হওয়া যায়?

প্রশ্রয় দেওয়া যে মানুষ পছন্দ করে না, সেও নিজের অজান্তেই কতবার নিজেকে প্রশ্রয় দেয়, সে হিসাব কেউ কি কষে? বেড়াজাল ছিন্ন করার ক্ষমতা নিয়েই মানুষ জন্ম নেয়। কিন্তু যে জাল নিজে বুনে নিজেকে আটকে রাখে, সেটিকে বেড়াজাল বলে না। যে ক্ষত গভীর হয়ে আমাদের ইঙ্গিত করে সে পরিণতির কথা ক্ষতের ভয়ে কতজন আছে বলে নিজেকে গুছিয়ে নেয় সবকিছু থেকে? মানুষ জন্মগতভাবেই নিজেকে ঠকিয়ে গেছে। সেটা কারও প্ররোচনায় নয়, ইশারায় নয়; কারও সুখের জন্য নয়- সবকিছু তার নিজের জন্যই। যে নিয়ম মানুষ তৈরি করে সে নিয়ম মানুষই ভাঙে; বনের কোনো পশু নয়। কতবার ভাঙলে একটা মানুষ একেবারে ভেঙে যেত সেটা যদি কোনো হিসাব সমীকরণে মেলানো যেত তাহলে মানুষ মরে যাওয়ার আগেই তাকে নিছক রূপ দিয়ে যেত নতুবা বেঁচে থেকে এর একটা অস্তিত্ব অনুভব করত। আসলে মানুষ যা পারে না সে ক্ষেত্রে তার যতটা আগ্রহ; সে যা পারবে তাতে তার আগ্রহ ততটা নয়। যদি তাই হতো তাহলে হয়তো পৃথিবীর সব মানুষ নিজেকে সফল মানুষ ভাবত। সফল হওয়া মানে শুধু এই নয়, যা চাইলাম তা পেয়ে গেলাম। হেরে যাওয়ার কথা হেরে গেলাম, মনের ইচ্ছা পূরণ করে নিলাম; তেমন কিছু নয়। সংকোচে ভরা নিঃশব্দে রাতের অন্ধকারে চোখের জল ফেলে এক বুক নিরাশার গল্প বয়ে বেড়ানো মানুষটা যখন দেখে তার চারপাশের সব রাস্তা বন্ধ; সে বোঝে সফলতা তেমন কোনো কিছু না! ঘুম থেকে উঠেই বারবার ব্যর্থ হওয়া মানুষটাও জানে সফলতা তেমন কিছু না! রাতের আঁধারে নেশাগ্রস্ত লোকটাও জানে সফলতা তেমন কিছু না! সবচেয়ে পরিতাপের বিষয়, আমরা সবচেয়ে সফল যাকে ভাবি, সেই হয়তো নিখুঁতভাবে জানে না সফলতা আসলে কী!

দূর থেকে যাকে সুখী কিংবা সফল ভাবি আমরা, সে নানাভাবে জানে তার কত কিছুতে অসুখ; কত কিছুতেই ব্যর্থ। যে মানুষ ২০ বছর বয়সে নিজেকে সুন্দর দাবি করে, সেই মানুষই বয়স ত্রিশে তার চেহারার ভিন্ন রূপ দেখতে শুরু করে শুধু তার ক্যারিয়ারের সৌন্দর্যের জন্য। যে গল্প আপনার নয় তাতে চোখের জল ফেলে যেভাবে আপনার করে নেন, সেই গল্পটা আপনার করার জন্য আপনি কী করছেন? অত্যন্ত লোভী মানুষকে ভালোবেসে আপনি যখন সেই মানুষকে দোষ দেন, সেই একই অপরাধে আপনাকে আপনি কতবার দোষারোপ করেছেন?

শিক্ষক, সুফিয়া মতিন মহিলা কলেজ, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ

মন্তব্য করুন