নিরবচ্ছিন্ন দখল-দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের নদনদী। অবৈধ দখল আর নানারকম দূষণের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সব নদনদীকে 'জীবন্ত সত্তা' ঘোষণা করে উচ্চ আদালতের রায় থাকার পরও নদীগুলোর ভাগ্য বদলায়নি। দূষণ আর দখলদারদের কবল থেকে মুক্তির বদলে উল্টো নদী দখল-দূষণ আরও বেড়েছে। প্রমত্তা অনেক নদীই অস্তিত্ব হারিয়ে মৃতপ্রায় সরু খালে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ, স্লুইসগেট, রাবার ড্যাম, ব্রিজ এবং নদী দখল করে নানা অবকাঠামো নির্মাণের কারণে পানিপ্রবাহ কমে গিয়ে গত ৫৭ বছরে ১৫৮টি নদী শুকিয়ে গেছে। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, দেশের ২৯টি প্রধান নদনদীর দূষণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষত শুস্ক মৌসুমে (নভেম্বর-এপ্রিল) এসব নদীর পানির দূষণ বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছে।

অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়হীনতার ফলে এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত কর্তৃপক্ষকে তোয়াক্কা না করে ইচ্ছামতো নদনদী দখল করে মার্কেট, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলছে। কোথাও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, কোথাও নদীর মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মাছ চাষ করা হচ্ছে। কিন্তু এসব দেখার মতো বা এর বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রশাসনিক উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো এক অদৃশ্য কারণে তা থেমেও যায়। স্বভাবতই প্রভাবশালী অবৈধ দখলকারীরা বহাল তবিয়তে থেকে নবউদ্যমে দখল কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করে।

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের পানি নিস্কাশনের একমাত্র পথ মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ পলি জমে নাব্য হারিয়েছে। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে সরকার নদী-খাল খনন, স্লুইসগেট নির্মাণ ও উপকূলীয় বাঁধ সংস্কার, নতুন বাঁধ নির্মাণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এসব পদক্ষেপ জলাবদ্ধতা দূরীকরণে কোনো কার্যকর ফল বয়ে আনেনি, বরং মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়েছে। দেশের বৃহত্তম দুটি নদী পদ্মা-যমুনা এবং বৃহত্তর জলাভূমি চলনবিলের মধ্যে প্রধান সংযোগ রক্ষাকারী নদ হচ্ছে বড়াল। ১৯৮১ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদের উৎসমুখে ৩০ ফুট চওড়া এবং আট ফুট উচ্চতার একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করে। পরে আরও একটি ছোট স্লুইসগেট এবং তিনটি ক্রস বাঁধ নির্মাণ করা হয়, যা পরে নদীর বুকে পাকা রাস্তা হিসেবে ব্যবহূত হয়।

ভূমিদস্যুরা ভুয়া আরএস রেকর্ডের মাধ্যমে বড়াল নদের জায়গা দখল করে নিয়েছে। পাশাপাশি গৃহস্থালির বর্জ্য, হাসপাতাল, গরুর খামার, পোলট্রি খামার, ক্লিনিক, হোটেল-রেস্টুরেন্টের বর্জ্য এ নদে ফেলার কারণে প্রতিনিয়ত ভরাট ও দূষিত হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা শহর ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীরও একই দশা। এ নদীগুলোর দুই তীর দখল করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নদীগুলোতে ফেলা হয়। সাভারে বর্জ্য পরিশোধনাগার তৈরি হলেও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কারখানাগুলোর বর্জ্য ফেলে বুড়িগঙ্গার মতো ধলেশ্বরী নদীও দূষিত করা হচ্ছে। অনুরূপভাবে মেঘনা, ভৈরব, হালদা, কর্ণফুলী, রূপসা নদীও একই পথে এগোচ্ছে। নদীর প্রতি নির্মম আচরণ বন্ধ না করলে আগামী প্রজন্মের সমূহ বিপদ আছে।

উন্নয়নকর্মী

মন্তব্য করুন