বর্ণমালা

সিলেটি নাগরীলিপি পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪

এসএম মুন্না

বাংলা ভাষায় রয়েছে দুটি বর্ণমালা। এর একটি প্রমিত বাংলা, অন্যটি সিলেটি নাগরী, যা বিশ্বের ইতিহাসে খুবই বিরল ঘটনা। বাংলা ভাষা ছাড়া একই ভাষায় একাধিক বর্ণমালার ঐতিহ্য রয়েছে শুধু স্কটল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলে। সিলেটি নাগরীলিপির উদ্ভব চতুর্দশ শতকে আরবি, কাইথি, বাংলা ও দেবনাগরী অনুসরণে। এ লিপিতে রচিত হয়েছে দু'শতাধিক গ্রন্থ, দলিল-দস্তাবেজ এবং পরিচালিত হয়েছে সেকালের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম। নাগরীলিপির সাহিত্য ধারণ করেছে সিলেটি উপভাষা বা আঞ্চলিক ভাষা। নাগরী সাহিত্যে মূলত ইসলামী নানা কাহিনী বিধৃত হয়েছে। মানবিক প্রেম-প্রণয় উপাখ্যানও প্রাধান্য পেয়েছে এতে।
এ ছাড়াও নবীচরিত, ধর্মের বাণী, রূপকথা, সামাজিক রচনা, সুফিবাদ, ফকিরি গান, বীরত্বগাথা এবং মরমি কাহিনীমূলক পুঁথি রচিত হয়েছে।
প্রায় ছয়শ' বছর বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বিশেষত সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত ছিল এ লিপির সাহিত্য। সিলেট ছাড়াও কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ভৈরব, করিমগঞ্জ, শিলচর ও আসামে এর ব্যবহার ছিল। প্রায় ৫০ বছর আগে এসব অমূল্য গ্রন্থ কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। বাংলা ভাষার এ গৌরবগাথা এখন বিলুপ্তপ্রায়। তবে এই হিরণ্ময় অধ্যায়টি পুনরুদ্ধার করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার অভিলাষে কয়েক বছর নিরন্তর গবেষণা করে আসছেন মো. আবদুল মান্নান ও মোস্তফা সেলিম। তারই প্রয়াস হিসেবে এই দু'জনের সম্পাদনায় উৎস প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে বিলুপ্ত নাগরীলিপির ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমন্ব্বয়ে 'নাগরী গ্রন্থসম্ভার'। মূল পাঠে নাগরীলিপির পাশাপাশি বাংলা লিপ্যন্তর সংযোজন করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রন্থের পরিশেষে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক শব্দাবলির অর্থ, পাশাপাশি নাগরীলিপি ও বাংলা বর্ণমালার বর্ণচিত্র।
গ্রন্থগুলো হলো_ কেতাব হালতুন্নবী (লেখক :মুন্সী সাদেক আলী), আহকামে চরকা (মৌলবী আকবর আলী), বাহরাম জহুরা (মহম্মদ জওয়াদ), চন্দ্রমুখী (মুহম্মদ খলিল), দেশ চরিত (ছৈয়দুর রহমান), দইখুরার রাগ (মবিন উদ্দীন মুন্সী দইখুরা), হাশর মিছিল (মুন্সী সাদেক আলী), হাশর তরান (শাহ আবদুুল ওয়াহাব চৌধুরী), হরিণনামা (মুন্সী আবদুুল করিম), হুসিয়ার গাফেলিন (মুন্সী ওয়াজিদ উল্লাহ), কড়িনামা (মুন্সী আবদুুল করিম), মায়ারশি দুছরা (হাজি ইয়াছিন), মহব্বতনামা (মুন্সী সাদেক আলী), মশকিল তরান (শিতালং শাহ), নূর পরিচয় (শাহ আরমান আলী), ওছিওতুন্নবী (মুন্সী জাফর আলী), সাত কন্যার বাখান (সৈয়দ শাহনূর), ছদছি মছলা (আবদুুল করিম), সহর চরিত (মুন্সী আছদ আলী), ছয়ফুল বেদাত (মুন্সী ইরফান আলী), সোনাভানের পুঁথি (মুন্সী আবদুুল করিম), জঙ্গনামা (ওয়াহেদ আলী), ভেদ চরিত (ফকির আমান), ভেদ কায়া (শাহ আবদুুল ওয়াহাব চৌধুরী) ও মুজমা রাগ হরিবংশ (দীন ভবানন্দ)। নাগরীলিপির গ্রন্থসম্ভার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বর্ণাঢ্য স্মারক। সমকালের সঙ্গে আলাপকালে এ লিপি সম্পর্কে নানা দিক তুলে ধরেন নাগরীলিপির গ্রন্থসম্ভারের অন্যতম গবেষক ও উৎস প্রকাশনের প্রকাশক মোস্তফা সেলিম। তিনি জানান, এই গ্রন্থসম্ভারের প্রকৃত দাম ১০ হাজার টাকা। তবে একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। অগ্রিম বুকিং দিলেও বিশেষ ছাড় পাওয়া যাবে।
সিলেটি নাগরী বাংলা লিপির বিকল্প এক প্রকার লিপি। এক সময় প্রধানত সিলেট অঞ্চলে এটি প্রচলিত ছিল। তবে সিলেটের বাইরে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা এবং আসামের কাছাড় ও করিমগঞ্জেও এর ব্যবহার ছিল। আরবি ও ফারসি ভাষার সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে যে মুসলমানি বাংলা ভাষার প্রচলন হয়, তার বাহক হিসেবে সিলেটি নাগরী ব্যবহৃত হতো। সিলেটের তৎকালীন মুসলমান লেখকরা বাংলার পরিবর্তে এই লিপিতেই ধর্মীয় বিষয়গুলো চর্চায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হজরত শাহজালালের (র.) সমসাময়িক মুসলমান ধর্ম প্রচারকগণ এই লিপিতে ধর্মমত লিপিবদ্ধ করতেন বলে জানা যায়।
সিলেটি নাগরী বর্ণমালায় বর্ণ সংখ্যা ৩২। এ লিপি কোনো মৌলিক বর্ণ নয়। বর্ণ দ্বৈতস্বর ও যুক্তব্যঞ্জন সিলেটি নাগরীতে বর্জন করা হয়েছে। সিলেটি নাগরীলিপিমালায় বাংলা, দেবনাগরী, কাইথি ও আরবি লিপি থেকে কয়েকটি বর্ণ গ্রহণ করা হয়েছে এবং রয়েছে কয়েকটি মৌলিক বর্ণ। সিলেটি নাগরীলিপির বর্ণনাম ও উচ্চারণ হুবহু বাংলার মতো। সিলেটি নাগরী কোনো স্বতন্ত্র ভাষা নয়। এটি স্বতন্ত্র বর্ণমালা। বাংলা বর্ণমালার বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
মোস্তফা সেলিম জানান, নাগরীলিপির ওপর পিএইচডি করেছেন দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকজন। তার মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের অধ্যাপক গোলাম কাদের, ড. মোহাম্মদ সাদিক ও ভারতের অধ্যাপক মোসাবি্বর ভূঁঁইয়া। ব্রিটিশ দম্পতি উইলিয়াম লয়েড ও ড. সু লয়েড, রেজা গোয়েন এ লিপি নিয়ে গবেষণা করেছেন।
তিনি আরও জানান, অল্প পরিসরে হলেও এই লিপির প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এরই মধ্যে সিলেটের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই লিপিটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। সিলেটে গড়ে তোলা হচ্ছে নাগরী পাঠশালা, ঢাকায় নাগরী জাদুঘর। বের হবে নাগরীলিপি অভিধান। এই লিপি চর্চা করার জন্য সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে।
তিনি জানান, লিপিটি আরও বোধগম্য করার জন্য চলতি বছর জুলাইতে ঢাকায় প্রথমবারের আয়োজন করা হচ্ছে নাগরীলিপি সম্মেলন। এখানে দেশি-বিদেশি ভাষাবিদ-প িতরা অংশ নেবেন।