পুলিশের আবাসিক ভবনের ছাদে গলাকাটা লাশ

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪      

সমকাল প্রতিবেদক

রাজধানীর পল্টন থানার পেছনে পুলিশের আবাসিক ভবনের ছাদে এক যুবককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে তার মস্তকবিহীন লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী ওই যুবকের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। নিহত যুবক পুলিশ, নাকি বাইরের কেউ_ সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড, কে বা কারা এতে জড়িত, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। 'সুরক্ষিত' ওই এলাকায় এমন হত্যাকাণ্ডে খোদ পুলিশ-কর্তারাও বিস্মিত। হত্যাকাণ্ডে ওই ভবনের বাসিন্দা কোনো পুলিশ সদস্য জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নয়াপল্টন এলাকায় পল্টন থানা ভবনের পেছনে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের থাকার পাঁচতলা ভবনটিতে ট্রাফিক ছাড়াও পুলিশের বিভিন্ন শাখার সদস্য এবং কিছু আনসারও থাকেন। ভবনের নিচতলায় ক্যান্টিন, ওপরের চারটি তলায় থাকার ব্যবস্থা। প্রতিটি তলায় অন্তত ৮৮ জন করে থাকেন। নিচ থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত কংক্রিটের সিঁড়ি।
পাঁচতলা থেকে ছাদে যাওয়ার জন্য ভবনের মাঝামাঝি স্থানে একটি সরু লোহার মই।
পল্টন থানার ওসি মোরশেদ আলম সমকালকে জানান, সকাল ১১টার দিকে তারা ভবনের ছাদে লাশ পড়ে থাকার খবর জানতে পারেন। পার্শ্ববর্তী পুলিশ হাসপাতালের ১০ তলা ভবন থেকে প্রথমে কেউ লাশটি দেখতে পান। তবে সেই ব্যক্তি ভেবেছিলেন, কেউ অচেতন হয়ে পড়ে আছেন। তিনি চিৎকার করে নিচে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিষয়টি জানান। এর পর সেখানে গিয়ে রক্তাক্ত লাশটি পাওয়া যায়। আশপাশে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। ধারণা করা হচ্ছে, সোমবার রাতের কোনো একসময়ে ওই যুবককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তার পেটে ও হাতে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন। পরনে গাঢ় নীল ট্রাউজার ও কালো গেঞ্জি। ঘটনাস্থল থেকে একটি আংটি উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি হত্যায় জড়িত কারও হতে পারে। এ ছাড়া ভবনের নিচের ড্রেনে একটি কালো জ্যাকেট ও সাদা শার্ট পাওয়া গেছে। শার্টের পকেটে ছিল ৯৩৫ টাকা।
ওসি জানান, নিহত যুবক ট্রাফিক ভবনেরই বাসিন্দা কি-না, তাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ, সকালে অনেকেই নির্ধারিত দায়িত্বে চলে যান। রাতে তালিকা অনুযায়ী গণনা করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, নিহতের শরীরের গঠন বেশ মজবুত। একা কারও পক্ষে তাকে ঘায়েল করা সহজ নয়। তাই হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি জড়িত ছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে। হত্যার পর তার মাথাটি আলাদা করে সরিয়ে ফেলা হয়। নিহতের পরিচয় যেন সহজে না জানা যায়, সে জন্যই মাথাটি সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে। ওই ভবনে এবং আশপাশে অনেক খুঁজেও মাথাটি পাওয়া যায়নি।
তদন্ত সূত্র জানায়, নিহত ব্যক্তি ট্রাফিক ভবনের কোনো বাসিন্দার পূর্বপরিচিত। সে সূত্র ধরেই সোমবার গভীর রাতে তিনি আসেন। নারীঘটিত কোনো জটিলতা বা অবৈধ আয়ের ভাগাভাগি নিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাঁচতলা ভবনটিতে পল্টন থানা চত্বরের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। পুলিশ স্টাফ কোয়ার্টার দিয়েও যাওয়া যায়। ভবনটির বাসিন্দা পুলিশ সদস্যদের বেশিরভাগই দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তারা কিছু জানেন না। কেউ কেউ ভয়ে কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পঁ?াচতলার দুই বাসিন্দা জানান, রাত ৩টা বা তার কিছু সময় পরে তারা ছাদে হুড়োহুড়ির আওয়াজ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে যে ভয়ঙ্কর কিছু ঘটছে, তাদের তা মনে হয়নি।
পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার আশরাফুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, সুরক্ষিত এ এলাকায় পুলিশ ছাড়া কারও প্রবেশের কথা নয়। তবে ট্রাফিক ভবনের বাসিন্দাদের আত্মীয় বা বন্ধুরাও আসেন। এ রকম স্থানে কীভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্র জানায়, নিহতের পরিচয় উদ্ঘাটনের সুবিধার্থে সিআইডি ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে তার ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আপাতত লাশটি রাখা হবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে। থানা পুলিশের পাশাপাশি সিআইডি, ডিবিসহ একাধিক তদন্ত সংস্থা ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে।