ঘুষ দিয়েও মিলছে না সরকারি বাসা

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪      

শরীফুল ইসলাম ও রাজবংশী রায়

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব খলিলুর রহমান। এক দশক ধরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। আবাসন পরিদফতরে সরকারি বাসা বরাদ্দ পাওয়ার জন্য ঘোরাঘুরি করছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী-সচিবের কাছে একাধিকবার ধরনাও দিয়েছেন। শিগগিরই তাকে একটি সরকারি বাসা বরাদ্দ দেওয়া হবে_ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন আশ্বাসও পেয়েছিলেন। ওই আশ্বাসেই কেটে গেছে পাঁচ বছর। আজও সরকারি বাসা বরাদ্দ পাননি তিনি। শুধু খলিলুর রহমানই নন, কয়েক লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজধানীতে চাকরি করলেও তাদের বাসস্থান সুবিধা নেই। ভাড়া বাসাতেই থাকতে হচ্ছে। অথচ এমনও কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা একাধিক সরকারি বাসা ব্যবহার করছেন। আবার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন, যারা সরকারি বাসা পেতে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের টাকা দিয়েও পাচ্ছেন না। এমনও কর্মকর্তা রয়েছেন,
যাদের রাজনৈতিক লবিং রয়েছে; আবেদন করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাসা দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বাসা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ মারা গেলে বা চাকরি থেকে অবসরে গেলেও বাসা ছাড়ছেন না। তার ছেলেমেয়ে বা আত্মীয়স্বজন ব্যবহার করছে ওই বাসা। সংশ্লিষ্ট দফতর জানার পরও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
জানা গেছে, রাজধানী ঢাকায় প্রায় তিন লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। কিন্তু মাত্র ১৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আবাসন সুবিধা রয়েছে। একটি সরকারি বাসার জন্য আবেদন করার পর কেটে যায় কয়েক বছর। দেনদরবার করে এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎকোচ দিয়েও বাসার বরাদ্দ পাওয়া যায় না। চাহিদার তুলনায় বাসার সংখ্যা খুবই কম; কিন্তু আবেদন অনেক বেশি। ফলে সরকারি আবাসন পরিদফতরকে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। মন্ত্রী-এমপি বা সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে বাসা বরাদ্দ দেওয়ার জন্য সুপারিশ করছেন। তার পরও আবাসন পরিদফতর তাদের বাসা দিতে পারছে না। একটি বাসা খালি হওয়ামাত্র মন্ত্রী বা প্রভাবশালী কর্মকর্তার সুপারিশ নিয়ে ওই বাসার জন্য আবেদন করছেন অনেকে। এমনও দেখা গেছে, একই বাসার জন্য একজন মন্ত্রী তিন-চারজনের আবেদনপত্রে সুপারিশ করেছেন।
এ বিষয়ে সরকারি আবাসন পরিদফতরের পরিচালক ড. আশরাফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গত ৪০ বছরে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ঢাকায় নতুন কোনো ভবন নির্মিত হয়নি। প্রতিদিন বাসার জন্য তার দফতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভিড় জমান; কিন্তু তার করার কিছু নেই। তবে শিগগিরই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতে একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা শহরে প্রায় তিন লাখ সরকারি চাকরিজীবী রয়েছেন। অথচ বাসা আছে প্রায় ১৩ হাজার। এসবের মধ্যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার এ, বি ও সি টাইপের বাসা। এগুলো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত। প্রথম শ্রেণীর ক্যাডার, নন-ক্যাডার ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের জন্য রয়েছে পাঁচ হাজার ৫৯৫টি বাসা। এসবের ৮৬টি বাংলো ও ২০৬টি সুপিরিয়র শ্রেণীর। এগুলো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের (সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তা) বরাদ্দ দেওয়া হয়। এগুলো বাদ দিলে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তাদের জন্য ডি, ই ও এফ টাইপের বাসা থাকে পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। অথচ এ দুই শ্রেণীর কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার। এ ছাড়া কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রায় দুই হাজার বাসা রয়েছে।
আবাসন পরিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়া বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি বাসায় থাকার ব্যাপারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগ্রহ কম। কারণ বেতন থেকে যে অর্থ বাসা বাবদ কেটে নেওয়া হয়, ওই অর্থে সরকারি বাসার চেয়ে ভালো বাসায় থাকতে পারেন তারা। মফস্বল পর্যায়ে অনেক সরকারি বাসা খালি পড়ে থাকে। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের চিত্র ভিন্ন।
আবাসন পরিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, 'আজিমপুর, পাইকপাড়া ও কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারে কয়েকটি বাসা খালি হবে কয়েক মাস পর। তিন দিনে ওই বাসার জন্য শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। এ আবেদনে সুপারিশ রয়েছে একাধিক মন্ত্রীর। আবার কোনো আবেদনে একাধিক সচিবের সুপারিশ। এখন বলুন, বাসাটি কাকে দেব?'
পরিদফতরে বাসা বরাদ্দের জন্য দেনদরবার করতে এসে এক কর্মকর্তা বলেন, 'ভাই, একটি বাসার জন্য একজনকে এক লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে দেড় বছর ধরে ঘুরছি। কিন্তু বাসা বরাদ্দ পাচ্ছি না। সরকারি চাকরিতে যে বেতন, বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকতে গেলে প্রায় পুরোটাই চলে যায়। কী যে অবস্থায় আছি, বলে বোঝাতে পারব না। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে সততা নিয়ে চলব কীভাবে?'
পরিদফতরের আরেক কর্মকর্তা বলেন, 'অনেক দেশে সরকারি কর্মচারীদের ফ্ল্যাট কেনার জন্য বিনা সুদে ঋণ দেওয়া হয়। সারা জীবন চাকরি করে তারা সেটা পরিশোধ করেন। আমাদের দেশে সে ব্যবস্থা নেই।'
আরেক কর্মকর্তা বলেন, কেরানীগঞ্জ, কামরাঙ্গীরচরের মতো ঢাকার আশপাশের জায়গায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আবাসন প্রকল্প হাতে নিতে পারে সরকার। সেখানে ফ্ল্যাট বানিয়ে কর্মকর্তাদের দিতে পারে। বেতন থেকে মাসে মাসে কেটে সেটা সমন্বয় করা যেতে পারে। কিন্তু সেদিকে সরকারের আগ্রহ নেই।
জানতে চাইলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব গোলাম রাব্বানী সমকালকে বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সুবিধা নিশ্চিতে একাধিক পরিকল্পনা হতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত সরকারি বাড়ি ভেঙে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অব্যবহৃত সরকারি জমিতে নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ করা হবে। বাসা বরাদ্দে স্বচ্ছতা আনতে আবাসন পরিদফতরের কার্যক্রমে অটোমেশন পদ্ধতি চালু করা হবে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসন সমস্যা সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।