প্রতিভাবান সুয়ারেজ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪      

সৌমিত জয়দ্বীপ

প্রতিভাবান সুয়ারেজ

খেলায় মগ্ন লুইস সুয়ারেজ এএফপি

সংসারে ব্যাপক টানাটানি। কী হয়, কী হবে অবস্থা। এ অবস্থাতেই ছেলেটা ফুটবলের জন্য পাগলামি করেছে। হয়তো রাস্তায় খেলতে খেলতেই দিনের পর দিন পার করে দিয়েছে। তার যখন নয় বছর তখন বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর তাদের মা সাত ভাইকে কোলেপিঠে মানুষ করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই বাবার অবর্তমানে দারিদ্র্যের সেই ক্লেশ লুইস সুয়ারেজের জীবনকে প্রভাবিত করেছে; কিন্তু তিনি ফুটবল ছাড়েননি!
নিজের জীবন সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সুয়ারেজের অকপট স্বীকারোক্তি থেকেই শুনুন_ 'শৈশবটা আমার অনেক কষ্টে কেটেছে। ব্যাপারটা আপনি ধারণা করতে পারবেন। বড় পরিবার হওয়ার কারণে আমাদের ঘরে অনেক কিছুরই অভাব ছিল। যার অর্থ হলো, আমাদের অতি সাধারণ জীবন যাপন করতে হয়েছে। অনেক কিছু বিসর্জন
দিতে হয়েছে।' সুয়ারেজ যেদিন লিভারপুলের সঙ্গে ২২ দশমিক ৮ মিলিয়ন পাউন্ডের মতো বিশাল অঙ্কের চুক্তি করলেন সেদিন নিশ্চয়ই তার সেই জীবনের কথা মনে পড়ছিল!
ছোটবেলায় ভীষণ চঞ্চল ছিলেন। কিছুতেই তাকে আটকে রাখা যেত না। প্রচলিত একটা কোথাও শোনা যায়। মাত্র চার বছর বয়সেই তার ফুটবলশৈলী এমন মাত্রায় পেঁৗছেছিল যে, তিনি নাকি শুধু দৌড়ানোর চেয়ে বল নিয়েই বেশি গতিতে দৌড়াতে পাড়তেন! এ বিষয়টা মিলে যাচ্ছে তার কথাতেও, 'আমি খুব ছোট্ট বয়সে ফুটবল খেলতে শুরু করেছিলাম। চার বছরের মধ্যেই আমি বল ছাড়া পায়ের চেয়ে বল পায়ে নিয়ে আরও গতিতে ছুটতে পারতাম।'
তা ছুটতে তো পারতেনই; কিন্তু প্রতিভা বিকশিত হওয়ার জন্য তো যথাস্থান প্রয়োজন হয়। নইলে তো কত প্রতিভাই হারিয়ে যায়। সুয়ারেজের জন্য সে সুযোগটা এসেছিল অনেক পরে। ১৪ বছর বয়সে। সুযোগ পেলেন উরুগুয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্লাব ন্যাশিওনাল ডি মন্টেভিডিও ক্লাবের যুব দলে। বুঝে নিলেন, শৈশব থেকে যে স্বপ্ন তিনি দেখে আসছেন, সেই স্বপ্নছোঁয়ার ধারেকাছে এসে গেছেন। এখন শুধু নিজেকে বিকশিত করার পালা। নিজের সম্ভাবনা নিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। কারণও ছিল। ১১ বছরের মাথায় আর্জেন্টিনার লা প্লাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় যুব অনুশীলন ক্যাম্পে তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ভালো বুট না থাকায় তার ক্যাম্পে যোগ দেওয়া হয়নি। সুয়ারেজের ভাষায়, 'আমার সব স্বপ্ন সত্য হতে চলছিল। কিন্তু ক্যাম্পটা এতই ব্যয়বহুল ছিল যে, আমার যাওয়া হয়নি। কারণ, এক জোড়া বুট কেনার মতো টাকা আমার কাছে ছিল না।' তাই ১৪ বছর বয়সে যখন সুযোগটা পেলেন ন্যাশিওনালে, সেটায় মনোযোগ দিয়ে দিলেন সর্বস্ব ঢেলে।
আজকের যে সুয়ারেজকে আপনি চেনেন, তার বেড়ে ওঠার গল্পটা এমনই। রোদোলফো ও সান্দ্রা সুয়ারেজের চতুর্থ সন্তান লুইস আলবার্তো সুয়ারেজ ডায়াজ জন্মেছিলেন ১৯৮৭ সালের ২৪ জানুয়ারি। উরুগুয়ের সালতো শহরে। তার যখন ছয় বছর বয়স, তখন বাবার কাজের সূত্রে সুয়ারেজের পরিবার চলে গেল মন্টিভিডিওতে। রাজধানীর ধুলোবালিময় রাস্তায় বেড়ে উঠতে লাগলেন বর্তমান সময়ের এক প্রতিভাবান ফুটবলার।
তার মা সান্দ্রা ছেলের খেলার ঝোঁক দেখে মন্টেভিডিওতে ক্লাব খুঁজছিলেন। মায়ের কথাটা শুনলেই বুঝবেন মন্টিভিডিওতে এসে কীভাবে সুয়ারেজ ধীরে ধীরে ফুটবলার হয়ে উঠলেন_ 'যখন আমরা মন্টিভিডিওতে চলে এলাম, আমরা ওর জন্য একটা ক্লাব খুঁজছিলাম। আমি ইউরেটা নামের একটা ক্লাবের কথা শুনেছিলাম। যে ক্লাবটা অনেক বিত্তশালী মানুষ টাকা দিয়ে চালান। সে জন্য আমি ওকে সেখানেই নিয়ে গেলাম। কয়েকদিন পরই একটা প্রীতি ম্যাচে ওকে অতিরিক্ত খেলোয়াড় হিসেবে দলে রাখা হলো। তারা ম্যাচটা ২-০ গোলে হেরে যাচ্ছিল। তাই হয়তো হাল ছেড়ে দিয়ে লুইসকে নামিয়ে একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাইল। সে তিনটা গোল করে ফলাফলটা ৩-২ করে ফেলল।'
এরপর ধীরে ধীরে তার বেড়ে ওঠা। ২০০৫ সালে ন্যাশিওনাল থেকেই পেশাদার জীবন শুরু। তারপর গ্রোনিনজেন হয়ে ২০০৭ সালে নেদারল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব আয়াক্স। ২০১০ বিশ্বকাপে তার অসাধারণ পারফরম্যান্স ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোকে তাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করল। ২০১১ সালে সেই দৌড়ে জিতে গেল লিভারপুল। গত বিশ্বকাপে দিয়েগো ফোরলানের সঙ্গে তার অসাধারণ জুটিই তো উরুগুয়েকে আবারও পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। গত বিশ্বকাপ তাকে যেমন হিরো বানিয়েছে, ঠিক তেমনি জিরোও বানিয়েছে। বর্তমান সময়ের ফুটবলে যারা দুর্দান্ত প্রতিভাবান কিন্তু 'ব্যাডবয়' তকমাটা তাদের নিত্যসঙ্গী, সুয়ারেজ তাদের সামনের কাতারেই থাকবেন। উরুগুয়ের হয়ে ২০০৭ সালে অভিষেকের পর ৭৭ ম্যাচে ৩৪ গোল করা সুয়ারেজ গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার বিপক্ষে গোলে বল ঢোকার আগ মুহূর্তে সেই কুখ্যাত 'হ্যান্ডবল' করে এখনও ঘানার বিরাগভাজন। আয়াক্স ও লিভারপুলের হয়ে এখন পর্যন্ত ১১০টি করে ম্যাচ খেলা এই ব্যাডবয় ইংলিশ লীগে প্রতিপক্ষকে কামড় দিয়েও বহিষ্কার হয়েছেন।
এই হলেন সুয়ারেজ। ১৫ বছর বয়সে রেফারিকে মাথা দিয়ে ঢুস মেরে লাল কার্ড দেখেছিলেন। আবার এই সুয়ারেজই সাত বছর বয়সে বদলি হিসেবে নেমে দলের হাল ছেড়ে দেওয়া ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে সবার মন জয় করে নিয়েছিলেন। এই দ্বৈত সত্তাতেই সুয়ারেজ যেন ফুটবলের এক জলজ্যান্ত প্যাকেজ!