অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার অঙ্গীকার

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৪      

সমকাল প্রতিবেদক

উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয়েছে।
বিকেলে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভের 'শিখা চিরন্তনের' সামনে থেকে ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন পর্যন্ত বর্ণাঢ্য উৎসবমুখর শোভাযাত্রা বের হয়।
সূর্যোদয়ের ক্ষণে কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকালে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু ভবনে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালার। পরে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনসহ পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ছয় দিনের কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে গোটা রাজধানীকে আকর্ষণীয় ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড ও বেলুন দিয়ে সাজিয়ে তোলা
হয়।
বিকেলে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিভিন্ন সংগঠনের হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থকের পাশাপাশি সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হয়। বৃষ্টিস্নাত আবহাওয়ার মধ্যেও হেঁটে এবং বাস-ট্রাক-মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে চড়ে মানুষ এ শোভাযাত্রায় যোগ দেয়। অনেকেই বর্ণাঢ্য সাজে সজ্জিত ঘোড়া ও গরুর গাড়িতে চেপে, ঢাকঢোল আর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে এবং নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রার পরিবেশকে উৎসবমুখর করে রাখেন। সারিবদ্ধ ট্রাক ও মোটরসাইকেলের বহরও ছিল দেখার মতো।
বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এই শোভাযাত্রা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনেক আগে থেকেই নগরীর বিভিন্ন থানা-ওয়ার্ড-ইউনিয়ন ও এলাকাসহ ঢাকার পাশের জেলাগুলো থেকে নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের মানুষ সমবেত হতে শুরু করেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, মৎস্য ভবন ও শাহবাগ এলাকায়। বিকেল নাগাদ সেখানে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশ শেষে বিকেল সাড়ে ৪টায় শোভাযাত্রার যাত্রা শুরু হয়। এর সামনের ভাগে বিশালাকৃতির গাঢ় লাল-সবুজের জাতীয় ও দলীয় পতাকা ছাড়াও শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া প্রায় সবার হাতেই ছিল রঙ-বেরঙের ছোট ছোট পতাকা, প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। অনেকের হাতে ছিল বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও জাতীয় চার নেতার প্রতিকৃতিও। শত শত রঙ-বেরঙের বেলুনের সমাহার ছিল চোখে পড়ার মতো। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক বিশালাকৃতির বেশ কয়েকটি কাঠের নৌকা সবার দৃষ্টি কেড়েছে। পাশাপাশি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের যাত্রাপালা ও ট্রাকমঞ্চের আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারের সাজে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ছবিকে জীবন্ত করে তোলেন। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ব্যঙ্গাত্মক প্রতিকৃতি বহনসহ এদের কুশপুত্তলিকায় অনেককেই ঘৃণা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। শোভাযাত্রার পুরোভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারাসহ মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও সংসদ সদস্যরা।
বিকেল সোয়া ৫টায় শোভাযাত্রার প্রথম ভাগ যখন বঙ্গবন্ধু ভবনে গিয়ে পেঁৗছায়, তখনও শেষভাগ ছিল সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে। শোভাযাত্রাকে ঘিরে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত মৎস্য ভবন, কাকরাইল, শাহবাগ, বাংলামটর, এলিফ্যান্ট রোড, মিরপুর রোডসহ নগরজুড়ে তীব্র যানজট দেখা দেয়।
'শিখা চিরন্তনের' সামনে র‌্যালিপূর্ব সমাবেশে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, 'খালেদা জিয়া ঈদের পর আন্দোলন করে নাকি আমাদের পতন ঘটাবেন। গত সাড়ে পাঁচ বছর আমাদের পতন ঘটাতে গিয়ে তাদেরই পতন হয়েছে। এবার পতনের আন্দোলন করলে দেশের ইতিহাস থেকে বিএনপির নামই মুছে যাবে। আর আন্দোলনের নামে নৈরাজ্যের চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাই খালেদা জিয়ার বিষদাঁত ভেঙে দেবেন।'
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন বলেন, খালেদা জিয়ার আন্দোলন মানে মানুষ হত্যার আন্দোলন। ঈদের পর কেন, বাংলার মানুষ তাকে আর কোনো আন্দোলন করতে দেবে না। আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য করতে তাদের রাস্তায় নামতেও দেওয়া হবে না।
সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, 'আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিএনপি-জামায়াত ও খালেদা জিয়া যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, সেই আন্দোলন করতে পারবেন না।'
ঢাকা মহানগর সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম বলেন, 'ঈদের পরে আন্দোলন করার হুমকি দিয়েছেন খালেদা ও জামায়াত। তারা আজকের লোকসমাগম দেখলে আন্দোলন করার কথা মুখে নেবেন না।'
নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তৃতা করেন ডা. দীপু মনি, আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মুকুল চৌধুরী, শেখ বজলুর রহমান, কামাল আহমেদ মজুমদার, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আওলাদ হোসেন, হাজি মোহাম্মদ সেলিম, শাহে আলম মুরাদ, আবদুল হক সবুজ, আশরাফুন্নেসা মোশাররফ, ফজলুল হক মন্টু, খন্দকার শামসুল হক রেজা, অ্যাডভোকেট মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওছার, অপু উকিল, এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ, সিদ্দিকী নাজমুল আলম প্রমুখ।
জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সকালে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রচণ্ড বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল ৭টার মধ্যেই বঙ্গবন্ধু ভবন ও আশপাশের এলাকায় সমবেত হন তারা।
সকাল ৭টা ১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এ সময় সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। পরে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলনসহ পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে দলের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, 'আওয়ামী লীগ সরকার দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। অনেক রাজনৈতিক দল আছে, যারা অনেকবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেছে এবং আন্দোলন-সংগ্রামও করেছে। কিন্তু কম রাজনৈতিক দলই আছে, যারা ঠিকমতো দেশ পরিচালনা করেছে। আগামী প্রজন্মের প্রতি আমাদের আশা রয়েছে, তারা আওয়ামী লীগকে অনেক উঁচু জায়গায় নিয়ে যাবে।' তিনি বলেন, ৬৫ বছরে আওয়ামী লীগের অর্জন অনেক। এ অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গঠনেও আওয়ামী লীগ আরও অর্জন করবে।
প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, ওলামা লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, হকার্স লীগ, সমবায় লীগ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।