সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে হেরোইনের 'খনি'

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৪      

সোহেল মামুন ও তসলিম উদ্দিন, রাজশাহী সীমান্ত থেকে ফিরে

দেশের সীমান্তবর্তী উপজেলা রাজশাহীর গোদাগাড়ী। পদ্মাপাড়ের এই এলাকা ভারতের মুর্শিদাবাদের লালগোলার সঙ্গে লাগোয়া। পুলিশের নথি থেকে জানা গেল, গোদাগাড়ীর চরাঞ্চল দিয়েই ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি হেরোইন ঢোকে বাংলাদেশে। গোদাগাড়ী থানায় গিয়ে জানা গেল, গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি মামলাও হয়েছে হেরোইনের কারবারিদের বিরুদ্ধে। যেসব চালান পুলিশ ধরতে পারে না, সেগুলো হেরোইন ব্যবসায়ীরা ছড়িয়ে দেন সারাদেশে। স্থানীয় কিশোর-তরুণরা প্রাণঘাতী এ হেরোইনে আসক্ত হচ্ছে। তবে সে তুলনায় ফেনসিডিল ও ইয়াবা বা অন্য কোনো মাদকের বড় চালান এ পথ দিয়ে ঢোকে না। গোদাগাড়ী থানা থেকে বেরিয়ে এবার গন্তব্য সীমান্তবর্তী আষাড়িয়াদহ চর। কিন্তু থানার
গেটেই দেখা মিলল, এক বাবা তার ছেলেকে বেঁধে থানায় নিয়ে এসেছেন। খুঁজছেন ওসির কক্ষ। জানতে চাইলে বলেন, তার নাম শফিকুল ইসলাম। কৃষিকাজ করেন। রশি দিয়ে বাঁধা যুবকটি তার ছেলে রফিক। হেরোইনে আসক্ত। প্রতিদিন ঘর থেকে টাকা ও জিনিসপত্র চুরি করে। মাকে ধরে মারে। কারও কথা শোনে না। তাই জেলে দিতে এসেছেন থানায়। এতে যদি ভালো হয়। তিনি জানালেন, আর কোনো উপায় না পেয়েই এ পথ বেছে নিয়েছেন। হেরোইন কোথায় পায়_ জানতে চাইলে তিনি বলেন, গোদাগাড়ীতে হাত বাড়ালেই হেরোইন মেলে।
এর পর শফিক গেলেন ওসির কক্ষে। ততক্ষণে ওসি বেরিয়ে গেছেন। একজন উপপরিদর্শক পরামর্শ দিলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করে দিতে। মাদক নিরাময় কেন্দ্রের বিষয়ে জানতে চাইলে ওই পরিদর্শক বলেন, দুটি গ্রামে হেরোইন ব্যবসায়ী ও আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ দুই গ্রামে তিনটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। হেরোইনে আসক্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এতগুলো নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠেছে বলে জানান তিনি।
রাজশাহী মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটি জানায়, ১১টি জেলা ও ৭৬টি উপজেলা রয়েছে, যেখানে কোনো নিবন্ধিত মাকদ নিরাময় কেন্দ্র নেই। অথচ ওই দুই গ্রামেই রয়েছে তিনটি নিবন্ধিত নিরাময় কেন্দ্র। গোদাগাড়ীর একটি বেসরকারি সংস্থা আসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক নামজুল হক জানালেন, গত ছয় বছরে হেরোইনে আসক্ত হয়ে কেবল গোদাগাড়ীতেই মারা গেছে ৬৬ জন। তাদের কেন্দ্র থেকে বছরে গড়ে ১২০ জন আসক্তকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করা হয়। এরা বেশিরভাগই বয়সে তরুণ।
এতে আরও স্পষ্ট হলো, গোদাগাড়ী এলাকায় মাদকের রমরমা বাণিজ্য রয়েছে। কিন্তু কারা এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত? গোদাগাড়ীর আষাড়িয়াদহ চর ও পাশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের আতুলি ইউনিয়নের চরসহ কয়েকটি গ্রামে দু'দিন ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার অন্তত অর্ধশত লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে যারা রাতারাতি ধনকুবের হয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই হেরোইন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
আষাড়িয়াদহ চরের এক হেরোইন বহনকারী জানান, সীমান্তে সব সময় কড়াকড়ি থাকে না। সুযোগ বুঝে কারবারিরা হেরোইন পাচার করে দেয়। তারা সেই হেরোইন পণ্য বা মালের সঙ্গে নদী পাড় করে গোদাগাড়ী পাঠান। যাদের কাছ থেকে হেরোইনের প্যাকেট নেন এবং যাদের কাছে দেন, তারা তাদের মতোই দরিদ্র লোকজন। কিন্তু নেপথ্যে কারা ব্যবসা পরিচালনা করেন, তাদের কাউকেই চেনেন না তারা। চর থেকে গোদাগাড়ী পেঁৗছে দেওয়াই তাদের কাজ। বিনিময়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দেওয়া হয় তাদের।
গোদাগাড়ী মহিলা ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ শহীদুল করিম বলেন, ধরা না পড়লে অল্প দিনেই বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়া যায় হেরোইন ব্যবসা করে। ছোটবেলা থেকে এ পর্যন্ত ডজনখানেক লোককে তিনি চেনেন, যারা হতদরিদ্র থেকে কোটিপতি হয়েছেন। তাদের এই ধনিক বনে যাওয়ার নেপথ্যে হলো হেরোইন পাচার। মিষ্টি ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন জানান, এ এলাকার বেশিরভাগ পরিবারেই কোনো না কোনো সদস্য হেরোইন সেবনকারী, চোরাকারবারি বা এই ব্যবসায়ীদের পরিচিত। আর ব্যবসায়ীদের পুলিশও চেনে বলে দাবি করেন তিনি।
গোদাগাড়ী থানার ওসি আবু মোকাদ্দেম আলী সমকালকে বলেন, গত এক বছরে তার অভিজ্ঞতা হলো এলাকায় যারা প্রভাবশালী, তারা হেরোইন চোরাচালানির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তাদের ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষী পাওয়া দুষ্কর। বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে যাদের হেরোইনসহ আটক করা হয়, তাদের বেশিরভাগ বহনকারী। জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাদের এক ধাপ ওপরের পাচারকারীর কথা তারা বলতে পারে। কিন্তু মূল ব্যবসায়ীকে তারা চেনে না।
তবে অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে হেরোইন চোরাচালান হয়ে আসছে। পুলিশের তালিকায় এসব চোরাচালানির নাম থাকলেও আটক করা হয় না। পুলিশের দাবি, তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
পুলিশ ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে জানা গেছে, হেরোইন ব্যবসা করে শূন্য থেকে রাতারাতি কোটিপতি হয়েছেন গোদাগাড়ীর চর আষাড়িয়াদহ ও চর আলাতুলি ইউনিয়নের প্রায় অর্ধশত মাদক ব্যবসায়ী। পুলিশ বলছে, এদের নামে থানায় মাদক চোরাচালানের একাধিক মামলা হলেও তাদের গ্রেফতার করতে পারছে না।
হেরোইন আনার রুট :বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ, দিয়াড়মানিক চক, কোদালকাটি, বগচর, বোয়ালমারী, চর আলাতুলির হাকিমপুর, নরেন্দ্রপুর ও ছয় রোশিয়া এবং ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার ললডোহরী, রামনগর ও সাইদাপুর এলাকা দিয়ে হেরোইন চোরাচালান হয়ে থাকে। আগে হেরোইন ব্যবসা করতেন, এখন অন্য পেশায় আছেন এমন এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, ভারত থেকে হেরোইনের চালান চরাঞ্চলে বসবাস করা সিন্ডিকেটের হাতে পেঁৗছে দেওয়া হয়। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে সেগুলো গোদাগাড়ী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠানো হয়। হেরোইনের মূল মালিকরা কখনও প্যাকেট বহন করেন না। কৌশলে সেগুলো বাহক দিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। বড় চালান পাঠানোর ক্ষেত্রে পুলিশের সহায়তা নেওয়া হয়।
পুলিশের তালিকায় অভিযুক্ত যারা :গোদাগাড়ীর মাদারপুর এলাকার শফিকুল ইসলাম (শফি মাঝি), জাহাঙ্গীর আলম, সাইফুল ইসলাম, আলমগীর হোসেন, আশরাফ আলী, জিয়া, তোফাজ্জল, নাজির হোসেন, বারুইপাড়ার রকিবুর রহমান, গড়ের মাঠের হান্নান, হযরত আলী, সেলিম রেজা, শহিদুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, হামিদ, নাজিবুর, মালেক সিঅ্যান্ডবির দুরুল হুদা, রবিউল ইসলাম, সামাউন কবীর, ফিটু, রবি, কালু বাবু (টেম্পো বাবু), আবু তাহের, শীষ মোহাম্মদ, হুমায়ন, আঁচুয়াভাটার ডাবলু, মেসবাহুল হক, রেলগেট এলাকার ইসমাইল হোসেন, আরিফুল ইসলাম, আবদুল্লাহ, শিবসাগর এলাকার লতিফ মাঝি, মহিশালবাড়ীর জাব্বার, ইব্রাহীম, জহুরুল ও নাইমুল, কোদালকাটির মনিরুল ইসলাম, আকবর আলী, ইসরাইল, দিয়াড়মানিক চকের জহুরুল ইসলাম, জোহাক, এসরা, লোকমান, মাটিকাটার শাহীন আলম, লালবাগের নাদিরা বেগম, শ্রীমন্তপুর এলাকার ফাহারুল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার মিঠু শেখ, কাঁঠালতলার সোহেল, প্রেমতলীর সাইদুর রহমান ও আতাউর রহমান। এ ছাড়া মহিশালবাড়ীর আজাদ ওরফে বহিরা আজাদ, আসাদুজ্জামান বুধু, তার জামাই হেলাল, কাটা রবি, আরিফুল, রুবিনা, আবদুর রশিদ মাঝি, জর্দা নুরুল, ল্যাংড়া মজিবুর, এরফান, ডালিম, শেখ জামাল ও আবদুল মালেক। এদের মধ্যে শফি মাঝি, জাহাঙ্গীর আলম, সাইফুল ইসলামসহ অন্যদের যারা চেনেন, তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই হেরোইন ব্যবসায়ীরা প্রত্যেকেই শূন্য থেকে এখন কোটিপতি।
পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ :গত ১৩ মার্চ এএসপি আবদুল হান্নান ও এসআই মেহেদী হাসান এক কেজি হেরোইনসহ গড়েরমাঠ এলাকার সেলিম রেজা ও শহিদুল ইসলামকে তাদের বাড়ি থেকে আটক করেন। স্থানীয় পত্রিকায় এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও ছাপা হয়। কিন্তু পরদিন সকালে তাদের জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। সূত্র জানায়, পুলিশের সঙ্গে রফা হওয়ায় মাদকের পরিবর্তের রাজনৈতিক মামলা দেওয়া হয়েছে। গত ৫ মে এক কেজি হেরোইনসহ তিন ব্যবসায়ী গোদাগাড়ীর লালবাগ এলাকার নাদিরা বেগম (৩০), সিরাজগঞ্জের চানু শেখ (৫২) ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিঠু মিয়াকে (২২) আটক করা হয়। অথচ পরের দিন তাদের ৫৪ ধারায় চালান দেয় পুলিশ।
হেরোইন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে সম্প্রতি এএসপি আবদুল হান্নানের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মীর শহিদুল ইসলাম জানান, এএসপি আবদুল হান্নানের বিষয়টি এখনও তদন্ত চলছে। এ কারণে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন এসআই মেহেদী হাসান। হেরোইন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশের বিষয়ে জানতে চাইলে মেহেদী হাসান বলেন, 'আমার বিষয়ে সবাই জানে। অনেকে লিখেছে। লিখে কোনো লাভ হবে না।'
পুলিশ সুপার যা বললেন :রাজশাহী পুলিশ সুপার আলমগীর কবির জানান, পুলিশ অন্যান্য কাজের ফাঁকে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে থাকে। মাদকদ্রব্য আসে সীমান্ত দিয়ে। পুলিশ যে পরিমাণ মাদকদ্রব্য আটক করেছে, তা যথেষ্ট নয়। জনবল থাকলে মাদকের বিরুদ্ধে আরও বেশি সফল অভিযান চালানো যেত। মাদক ব্যবসার সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।