প্রশ্নপত্র ফাঁস, আজ তদন্ত প্রতিবেদন পেশ

কোচিং সেন্টার ও বিজি প্রেসের দিকে সন্দেহের আঙুল

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৪      

সাবি্বর নেওয়াজ

চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের একাধিক কোচিং সেন্টার ও বিজি প্রেসের দিকেই সন্দেহের আঙুল তুলেছে সরকারি তদন্ত কমিটি। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে এ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে শনাক্ত করতে পারেনি তারা। কেবলমাত্র পরীক্ষা পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনা ও প্রশ্নপত্র প্রণয়ন-মুদ্রণে বেশকিছু সতর্ক অবলম্বনের সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে কমিটি। আজ মঙ্গলবার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের হাতে কমিটির
এ প্রতিবেদন তুলে দেওয়া হতে পারে। অবশ্য দীর্ঘ তদন্ত শেষেও মূল অপরাধীদের শনাক্ত করতে না পারায় প্রকৃতপক্ষে এবারের প্রশ্নফাঁসেরও কোনো কূল-কিনারা হলো না বলেই মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তদন্ত কমিটির প্রধান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন ও অর্থ) সোহরাব হোসাইনের কাছে গতকাল বিকেলে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান।
তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রশ্নপত্র কারা কোথা থেকে কীভাবে ফাঁস করেছে তা তারা নিশ্চিত হতে পারেননি। তবে নিশ্চিত হতে আপ্রাণ চেষ্টা তারা করেছেন। এজন্য তারা কমিটির একাধিকবার তদন্তের সময় বাড়িয়ে নিয়েছেন, বিজি প্রেস, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানও পরিদর্শন করেছেন। যদিও শেষতক তা পারেননি। তিনি বলেন, তবে ঢাকা ও ফরিদপুরের একাধিক কোচিং সেন্টার ও সরকারি মুদ্রণালয়কেই (বিজি প্রেস) তারা সন্দেহের শীর্ষে রেখেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনেও তা তারা বলেছেন। তদন্ত কমিটির গুরুত্বপূর্ণ অপর এক সদস্য সমকালকে বলেন, তারা প্রশ্ন ফাঁসকারীদের চিহ্নিত করতে না পারার অন্যতম কারণ হচ্ছে সবার সহযোগিতা না পাওয়া। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা আশানুরূপ পাননি।
তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রধান তিনটি সুপারিশসহ মোট ১৫টি সুপারিশ করেছেন। এসব সুপারিশের মধ্যে প্রশ্নপত্র ২ সেটের পরিবর্তে ৪ সেট ছাপানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালুর পর প্রতিটি বিষয়ের মাত্র ২ সেট করে প্রশ্ন ছাপানো হয়ে থাকে। এর আগে ৪ সেট করেই প্রশ্ন ছাপানো হতো। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এসএম ওয়াহিদুজ্জামান সমকালকে বলেন, ৪ সেট প্রশ্ন ছাপানো হলে তাতে সরকারি খরচ অনেক বেশি বেড়ে যায়। এ কারণে সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর আট সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ২ সেট করে প্রশ্ন ছাপানো হচ্ছে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ধারণা করছেন, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশনের সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের কেউ কেউ বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের সঙ্গে জড়িত। আবার ওইসব শিক্ষকদের বেশিরভাগই নিজ বাসায় ব্যাচ করে শিক্ষার্থী পড়ান। বিশেষ করে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষকরা এই কাজে জড়িত। তাদের মাধ্যমেও মুখে মুখে প্রশ্ন ছড়াতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের প্রশ্নফাঁসের কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছিল না। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে বিনামূল্যে কোনো কুচক্রী মহল সরকারকে বিব্রত করতেই এ কাজ করেছে। এজন্য সরকারি শক্তিশালী কোনো গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি ফের তদন্ত করাতে কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ রাখা হয়েছে। কমিটি বলেছে, বিজি প্রেসসহ প্রশ্নপত্র সংরক্ষণের বিভিন্ন স্থান যেমন ট্রেজারি, ব্যাংকের ভল্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রে ফুলপ্রুফ নয়।
গত ১০ এপ্রিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের পর ২৫ মে পর্যন্ত এইচএসসিতে বেশ কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা হয়েছে। এসব পরীক্ষার মধ্যে ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র, পদার্থ, রসায়ন ও গণিতের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। সরকারিভাবে শুধু ঢাকা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা স্বীকার করা হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সমকালকে বলেন, 'ইংরেজি দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে এ কথা আমরাই আগে সবাইকে জানিয়েছি, কেউ জানত না। পরীক্ষা বাতিল করেছি। আর গণিতের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কারণ পরীক্ষার দিন সকাল ৬টার আগেও প্রশ্ন ছাপা হয়নি।' তিনি বলেন, 'রসায়নেরও পরীক্ষা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে প্রশ্ন ছাপা হয়েছিল।' তিনি আরও বলেন, 'প্রশ্নপত্র আউট হয়েছে বললেও প্রশ্নের কী কী আউট হয়েছে তা কেউ বলছেন না। গণমাধ্যমে যা প্রকাশ হয়েছে তা অনেকটাই অনুমানভিত্তিক। বাণিজ্য করার জন্য এবং সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য ফেসবুকে প্রশ্ন ফাঁসের চেষ্টা করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'আমাদের ভুল-ত্রুটি আছে। তবে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রশ্ন ফাঁসের ব্যাপারে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। অনেক ব্যক্তিই প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে অনেক কথা বলছেন। তবে কে তাদের সেই প্রশ্ন দিয়েছেন সে সম্পর্কে কিছুই বলছেন না তারা। কারও নামই তারা বলেননি। তাই আমরাও কাউকে চিহ্নিত করতে পারিনি।'