খুলেছে শিক্ষার বন্ধ দরজা

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০১৫

মমিনুল ইসলাম মঞ্জু ও শাহিনুর রহমান শাহিন ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) থেকে

শিশুদের কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে কুড়িগ্রামের ছিটমহলগুলো। ঘড়ির কাঁটা সকাল ৭টা ছোঁয়ার আগে মিনা খাতুন ও নাজমুল ইসলামের মতো চার থেকে ছয় বছরের শিশুরা দলবেঁধে হৈচৈ করতে করতে নিজ এলাকার মসজিদ কিংবা কারও বাড়ির আঙিনায় স্থাপিত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে জড়ো হচ্ছে। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষকের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। এর পর সবাই সমস্বরে জোরে জোরে শিখছে বর্ণমালা। এভাবে সকাল ১০টা পর্যন্ত পাঠদানকালীন শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত চিৎকারে মুখরিত হয়ে থাকছে ছিটমহলের পাড়াগুলো। অথচ এই দৃশ্য মাত্র তিন দিন আগেও ছিল না। শুধু তিন দিন আগে কেন, দীর্ঘ ৬৮ বছর অপেক্ষার পর ছিটমহলে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো।
ছিটমহল বিনিময়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। এরই মধ্যে ছিটমহলগুলোতে শিক্ষার আলো ছড়াতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাদের মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় পহেলা রমজান থেকে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করেছে। শিক্ষাবঞ্চিত ছিটমহলগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার এটিই প্রথম উদ্যোগ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বন্ধ দরজা খুলে যাওয়ায় খুব খুশি ছিটমহলের অধিবাসীরা।
রোববার সকালে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত ভারতের দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে গিয়ে শোনা গেছে, চারদিক থেকে শিশুদের পড়া মুখস্থ করার ধ্বনি। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেল, সমন্বয়টারী মধ্যপাড়ায় আলতাফ হোসেনের বাড়ির আঙিনায়, ছোট কামাত মসজিদে এবং বালাটারী মসজিদে স্থাপিত শিক্ষাকেন্দ্রে ক্লাস চলছে। শিক্ষক আতিকুর রহমান আতিক, সুলতানা শিরিন ও কল্পনা আকতার শিশুদের বর্ণ পরিচয় শেখাচ্ছেন। এভাবে এখানে ২৩টি শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠদান চলছে।
ছোট কামাত এলাকার ছয় বছর বয়সী শিক্ষার্থী মিনা বেগম ও নাজমুল ইসলাম জানায়, তারা আগে লেখাপড়া করত না। এখানেই প্রথম লেখাপড়ার করার সুযোগ পেল।
শিক্ষিকা সুলতানা শিরিন জানান, তারা সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা করে পাঠদান করছেন। সপ্তাহের ছয় দিন হবে ক্লাস। প্রতিটি শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ জন। এ জন্য শিক্ষকরা মাসে দুই হাজার ৩০০ টাকা করে সম্মানী পাবেন।
এখানকার অধিবাসী আবদুস সামাদ, আলী হোসেন ও সুলতানা খাতুন জানান, ছিটমহলে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই। এখান থেকে বাংলাদেশের স্কুলগুলোর দূরত্ব কমপক্ষে তিন কিলোমিটার। তা ছাড়া ওই স্কুলগুলোতে বাংলাদেশের গ্রামের ঠিকানা দিয়ে শিশুদের ভর্তি করতে গিয়ে নানা বিড়ম্বনা ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে এতদিন। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ওই স্কুলগুলোতে পাঠানো সম্ভব ছিল না বলে তারা লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল।
ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা দীর্ঘ ৬৮ বছর থেকে বঞ্চিত ছিটমহলগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে প্রথম এগিয়ে আসায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতা জানান।
কুড়িগ্রাম জেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক নুরুল আমীন আনছারী জানান, সদর, ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে ১২টি ছিটমহল রয়েছে। এর মধ্যে দাসিয়ারছড়া ছিটমহলে ২৩টি এবং বড় গাড়োলঝাড়া, ছোট গাড়োলঝাড়া, ছেউতিকুর্শা, দীঘলটারী ও সাহেবগঞ্জ_ এই পাঁচটি ছিটমহলে একটি করে মোট ২৮টি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮৪০ জন। আপাতত মসজিদ এবং উৎসাহী ব্যক্তিদের বাড়ির আঙিনায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, আরবি, মাসলা-মাসায়েল, দৈনন্দিন জীবনের পাক-পবিত্রতা ইত্যাদি বিষয়ে পাঠদান করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এই শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে প্রাথমিক পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মধ্যে জনবসতি আছে, এমন সব ছিটমহলে ১০০টি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।