বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে ফসলের মাঠে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে গত ৫ মে। সাইনবোর্ডটি যখন টানানো হয়, তখন বাংলাদেশ ও ভারত_ উভয় দেশের মানুষ জেনে গেছে, ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হওয়াটা কেবল সময়ের ব্যাপার। সদ্যবিলুপ্ত ওই সব ছিটমহলের বাসিন্দারা ভেবেছিলেন, বিনিময় সম্পন্ন হয়ে গেলেই উন্নয়নযজ্ঞ শুরু হয়ে যাবে। তাই বাঁশপচাই-ভিতরকুটি ছিটমহলের আবুবকর সিদ্দিক স্বপ্নের বিদ্যালয়ের জন্য ভূমিদাতার ভূমিকা নিতে রাজি হয়ে গেলেন। প্রস্তাবিত ভিতরকুটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি করা হলো মো. আকবর আলীকে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভিতরকুটিতে কোনো বিদ্যালয় হবে কি-না, এ নিয়েই সংশয় প্রকাশ করলেন বাংলাদেশে যুক্ত হওয়া সদ্যবিলুপ্ত
ভারতীয় এই ছিটমহলটির প্রবীণ দুই ব্যক্তি মো. আকবর আলী ও মো. রমজান আলী। লালমনিরহাট শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর দিকে ধরলা নদীর পাশ ঘেঁষে এবং ধরলার শাখা ছোট নদী রত্নাই তীরে ভিতরকুটির অবস্থান। এখানে ১৫৬টি পরিবারের ৭০৪ জন মানুষের বাস।
তাদের মধ্যে প্রবীণতম দু'জনের একজন আকবরের বয়স ৭৮, রমজানের ৭০। এই আকবরই হলেন প্রস্তাবিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমিদাতা। রমজান সদ্যবিলুপ্ত ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির ভিতরকুটি শাখার সভাপতি। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়ে খুশি তারা। তবে আকবর বলেন, 'এখনও বাজারে গেলে মানুষ তাদের ছিটি বলে ডাকে।' দুই প্রবীণের সঙ্গে আলাপের সময় একটুক্ষণের জন্য সেখানে দাঁড়ালেন শমসের আলী এবং বললেন, 'কায়ও কায়ও (কেউ কেউ) ইয়ারকি করি কয়, হামরা নয়া বাংলাদেশি।' ভিতরকুটির এই তিন বাসিন্দা কতটা কায়মনে বাংলাদেশের মানুষ বলে পরিচিত হতে চান, তাদের বেদনাভারাতুর মুখই বলে দিচ্ছিল তা। শমসের আলী আক্ষেপ করে বলেন, 'হামারগুলা পুড়ি কাট (কয়লা) হয়া গেছি। হামারগুলার অবস্থা কাট-কয়লার মতো। ধুইলেও কাটের (কয়লার) যেমন মইলা (ময়লা) যায় না, হামারগুলারও যে মইলা যাচ্ছে না। কোনদিন যে মইলা সারবে? হামারগুলার ছিটি নাম যে কুনদিন মুচবে?'
সরেজমিন লালমনিরহাট সদর উপজেলায় অবস্থিত সদ্যবিলুপ্ত ভারতীয় ওই ছিটমহলে গিয়ে ছিটমহলবাসীর এমন অনেক হতাশার কথা শোনা গেল। তারা হতাশ আশপাশের মানুষের আচরণে। হতাশাটা বাড়িয়েছে উন্নয়ন নিয়ে সংশয়। লালমনিরহাট সদর উপজেলার বাঁশপচাই-ভিতরকুটি ও বাঁশপচাই এবং হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ও উত্তর গোতামারী ছিটমহল ঘুরে একই চিত্র পাওয়া গেল। উত্তর গোতামারীর বাসিন্দা মো. আজিজুল ইসলাম আশিক বলেন, 'সবাই আসছে, উন্নয়নের তালিকাও করে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আদতে কী হবে, তা দেখার অপেক্ষায় আছি আমরা।' আশিক জানান, তারা নিজেদের অর্থে উত্তর গোতামারীতে স্কুলের জন্য একটি ঘর তৈরি করেছেন। স্কুলটির নাম রেখেছেন সদ্যবিলুপ্ত ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মইনুল হকের নামে। আশিক নিজেও সমন্বয় কমিটির লালমনিরহাট জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। তিনি জানান, লালমনিরহাট জেলার বাংলাদেশে বিলুপ্ত ৫৯টি ভারতীয় ছিটমহলের মধ্যে ১৯টিতে কোনো জনবসতি নেই। বাকি ৪০টিতে লোকসংখ্যা নয় হাজার ৬৪৫ জন।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের কাছে বাঁশপচাই-ভিতরকুটি ও বাঁশপচাই ছিটমহল দুটির উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ভিতরকুটিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ভিতরকুটি ও বাঁশপচাই দুটি ছিটমহলেই রাস্তাঘাটসহ কিছু উন্নয়ন প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও কোনো প্রস্তাবনা অনুমোদিত হয়ে আসেনি।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে পাওয়া বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাবেক ছিটমহলবাসীর জীবনমান উন্নয়নের জন্য পরিকল্পিত পরিকল্পনা থেকে জানা যায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ২২টি রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার, ২১টি বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নে কামাত চ্যাংড়াবান্ধা ও কুলাঘাটে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র স্থাপন, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন বিভাগ বিভিন্ন জাতের গাছের চারা বিতরণ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগ বিদ্যুতায়নের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় ও সংযোগ প্রকল্প; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন পল্লী উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্রকল্প প্রশিক্ষণ প্রদান ও ঋণ বিতরণ; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন কাবিখা ও টিআর, ইজিপিপির আওতায় রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সংস্কার; প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন জেলা শিক্ষা অফিস একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ ও উপবৃত্তি প্রদান, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন সিভিল সার্জন অফিস চারটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন, ছিটমহলবাসীর মধ্যে এক হাজার ৯৯১ জন সক্ষম দম্পতিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী বিতরণ, দম্পতি রেজিস্ট্রেশনকরণ ও উঠান বৈঠক আয়োজন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিভিন্ন ফসলের আধুনিক জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে প্রদর্শনী স্থাপন, মৎস্য ও ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কৃত্রিম প্রজনন ও নেপিয়ার ঘাস চাষ প্রকল্প, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন মৎস্য অধিদপ্তর প্রশিক্ষণ প্রদান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা বিভাগ বয়স্ক-ভাতা, বিধবা-ভাতা, অসচ্ছল-প্রতিবন্ধী ভাতা কার্যক্রম, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান ও মাতৃত্ব-ভাতা প্রদান প্রকল্প, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন পানি উন্নয়ন বোর্ড পাটগ্রাম উপজেলার ছিটমহল এলাকায় ধরলা নদীর ডান তীরে এক হাজার মিটার স্থায়ী নদীতীর প্রতিরক্ষামূলক বাঁধ নির্মাণ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদান এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন আনসার-ভিডিপি ১০ দিন মেয়াদি গ্রামভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ৮৬ কোটি ১৮ লাখ ২৭ হাজার ২৯৫ টাকা।
লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমানের কাছে এই উন্নয়ন প্রস্তাবনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রতিটি প্রস্তাবই গেছে আলাদা আলাদা মন্ত্রণালয়ে। তবে সব প্রস্তাব একত্র করে গুচ্ছ প্রস্তাবনা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে। তাই তিনি আশা করছেন, খুব শিগগির প্রস্তাবগুলো প্রকল্প হিসেবে অনুমোদিত হয়ে আসবে।
ছিটমহলগুলোতে উন্নয়ন শুরু না হলেও শুরু হয়ে গেছে ভূমি জরিপ। সরেজমিন পরিদর্শনের সময় ভিতরকুটিতে জরিপকারীদের মাপজোখ করতে দেখা গেল। গ্রামের একমাত্র কাঁচা রাস্তাটির পাশে গাছতলায় টেবিল পেতে লালমনিরহাট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আসাদুজ্জামান সহকর্মীদের নিয়ে কাজ করছিলেন। আসাদুজ্জামান জানান, ভিতরকুটিতে ৪৫৫টি দাগ রয়েছে এবং এরই মধ্যে ১৬০ দাগের জরিপকাজ শেষ করে ফেলেছেন। মূলত দখলের ভিত্তিতে তারা জরিপ করছেন। দুই-তিন দিনের মধ্যে ভিতরকুটিতে জরিপের কাজ শেষ হয়ে যাবে। এর পর তারা যাবেন ধরলার অপর তীরে বাঁশপচাই ছিটমহলে।

মন্তব্য করুন