বিজয়ের মাস :বিশেষ আয়োজন

'রাধানগর অভিযান ছিল স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ'

প্রকাশ: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৫      

ওয়াকিল আহমেদ হিরন

'রাধানগর অভিযান ছিল স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ'

এস আই এম নূরুন্নবী খান বীরবিক্রম

উত্তাল মার্চের দিনগুলোতে পাকিস্তানের কোয়েটা ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণরত ছিলেন তিনি। সেখান থেকে বিমানে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এসে নামেন একাত্তরের ২৮ মার্চ সকালে। দেশে তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালিয়ে তিনি ২ এপ্রিল যশোর সেনানিবাস দখলের সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। অবতীর্ণ হন নেতৃত্বের ভূমিকায়। ১২ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের প্রতি-আক্রমণের মুখে যশোর রণাঙ্গন ত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এর পর ১৫ মে থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেল্টা কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে বিভিন্ন রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে রেখেছেন বীরত্বপূর্ণ অবদান।
গত শুক্রবার বিকেলে মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় নিজ বাসভবনে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল প্রকৌশলী এস আই এম নূরুন্নবী খান বীরবিক্রম জানালেন যুদ্ধদিনের সেই সব কাহিনী। দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি বৃহত্তর যশোর, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ এবং সর্বশেষ সিলেট রণাঙ্গনের বিভিন্ন অভিযানে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব দেওয়ার কথা জানালেন। বললেন, সেই সব যুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ তার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের ঘটনা। সাহসী এই মুক্তিযোদ্ধা বিশেষভাবে বললেন যশোর সেনানিবাস, পাঁ?চবিবি, বিরল রেলস্টেশন, বাহাদুরাবাদঘাট, দেওয়ানগঞ্জ,
রৌমারী মুক্তাঞ্চল, চিলমারী, উলিপুর, ছাতক, রাধানগর, গোয়াইনঘাট, গোবিন্দগঞ্জ, লামাকাজী ঘাট ও সিলেট শহর শত্রুমুক্ত করার কথা। তবে ২৮ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত সিলেট জেলার ডাউকি, তামাবিল সীমান্তসংলগ্ন পাকিস্তান বাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষাবূ্যহ রাধানগর অভিযানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, রাধানগর অভিযান ছিল সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ।
বর্তমানে ৭৪ বছর বয়সী সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ১৯৮১ সালে অবসর নেন। কর্নেল নূরুন্নবী অবসর নিয়ে থেমে যাননি, বরং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক কাগজে নিয়মিত লেখা শুরু করেন, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের প্রণেতা এবং শুধুই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের প্রকাশনা সংস্থা কলম্বিয়া প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় বীরবিক্রম উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। ১৯৭৬-৭৮ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের উপদেষ্টা এবং অধুনালুপ্ত পাক্ষিক দুর্বার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন তিনি।
নূরুন্নবী বলেন, 'একাত্তরের ২৬ নভেম্বর মিত্রবাহিনীর ৫/৫ গুর্খা রেজিমেন্ট ব্যাপক আর্টিলারি ফায়ার সাপোর্ট নিয়ে সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তসংলগ্ন রাধানগরে পাকিস্তানিদের অবস্থানে আক্রমণ করে ব্যর্থ হয়। মিত্রবাহিনীর পক্ষে চারজন অফিসারসহ ৮০ জন নিহত ও শতাধিক আহত হন। এর মাত্র একদিন পর ২৮ নভেম্বর রাধানগরে পাকিস্তানিদের অবস্থান আক্রমণ করে দখল নিতে মিত্রবাহিনীর সেক্টর কমান্ডার কর্নেল রাজসিংহ আমাকে নির্দেশ দেন। ওই দিন গভীর রাতে ১৬০ জন সৈনিক নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার স্থানীয় সদর দপ্তর রাধানগর এলাকার ছোটখেল গ্রামটির দখল নিতে যাই। মিত্রবাহিনীর কোনো ফায়ার সাপোর্ট না নিয়ে নীরব আক্রমণে (সাইলেন্ট অ্যাটাক) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা।' তিনি বলেন, 'দীর্ঘ এক মাস পাকিস্তানিদের এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঘিরে রাখার কারণে শত্রুর প্রতিটি অবস্থান, অস্ত্রবল ও জনবলের ব্যাপারে আমার সঠিক ধারণা হয়েছিল। এফইউপি (ফর্ম-আপ-প্লেস) থেকে আক্রমণে যাওয়ার আগে আমাদের ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক শাফায়াত জামিল ডাউকি থেকে গভীর রাতে আসেন। আনুমানিক ভোররাত ৪টার দিকে তিনি আমাদের সঙ্গে এক সারিতে আক্রমণে অংশ নেন এবং আমরা শত্রুর অবস্থান ছোটখেলের দিকে এগিয়ে যাই। সে সময় আমার ওপর নির্দেশ ছিল, শত্রুর অবস্থানে উঠে পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে মল্লযুদ্ধে (হাতাহাতি) জড়িয়ে পড়া এবং তাদের অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করা। যথারীতি আমার সৈনিকরা পাকিস্তানিদের ছোটখেল অবস্থানে ব্যাপক হ্যান্ডগ্রেনেড নিক্ষেপ করে উঠে পড়ে। মল্লযুদ্ধে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করে পাকিস্তানিরা তাদের অবস্থান ছেড়ে পালিয়ে পাশের কাশবনগুলোতে আশ্রয় নেয়। বাঁ পাশে আক্রমণকারী সৈনিকদের সঙ্গে থাকা ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক মেজর শাফায়াত জামিল (পরে কর্নেল ও বীরবিক্রম) গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এলাকাটি কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের পুরো দখলে চলে আসে। গুরুতর আহত অবস্থায় পেছনে লুনি গ্রাম থেকে ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক কয়েকটি নির্দেশনা দিয়ে একটি চিরকুট পাঠান। ওই চিরকুটে তিনি আমাকে ব্যাটালিয়ন অধিনায়কসহ ডাউকি এলাকার সব মুক্তিযোদ্ধার কমান্ডারের দায়িত্ব অর্পণ করেন এবং যে কোনো কিছুর বিনিময়ে ছোটখেল অবস্থানটি দখলে রাখতে বলেন। অবস্থানটি দখল করার পর পাকিস্তানিদের মজুদে থাকা প্রচুর গোলাবারুদ ও সৈনিকদের খাবার পেয়ে যাই।'
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নূরুন্নবী বলেন, 'কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাপক আর্টিলারি ফায়ার সাপোর্টের মাধ্যমে পাকিস্তানিদের প্রতি-আক্রমণ শুরু হয়। সকাল ৮টার দিকে পাকিস্তান বাহিনীর নিক্ষেপিত একটি আর্টিলারির গোলা আমার কমান্ড পোস্টে এসে পড়ে। আমি কোনোমতে বাংকারের ভেতরে যেতে পারলেও রানার (আমার বডিগার্ড) সিপাহি নূরুল হকের দেহ শত্রুর গোলার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তার শরীর টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় বাংকার থেকে একটি স্পি্নন্টারের টুকরা আমার পিঠে এসে পড়ে। এতে আমিও সামান্য আহত হই। সেই স্পি্নন্টার এখনও পিঠে আছে। ব্যথা হয় মাঝেমধ্যে।' তিনি বলেন, 'আমার বিশ্বস্ত দেহরক্ষী সিপাহি নূরুল হক দেশমাতৃকার স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হন। সিপাহি নূরুল হককে পরে যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। পরবর্তী সময়ে কালিহাতীর আর্মি মেডিকেল সেন্টারে অবস্থিত স্টেডিয়ামটির নামকরণ করা হয় তার নামে।'
মিত্রবাহিনীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ২৯ নভেম্বর দুপুর পর্যন্ত পাকিস্তানিদের রাধানগর প্রতিরক্ষার অন্যান্য অবস্থানে আক্রমণ হয়নি। ওই দিন রাত ১০টা পর্যন্ত বারবার আক্রমণ করেও পাকিস্তানিরা আমাদের ছোটখেল অবস্থানটি দখলে নিতে পারেনি। এদিন সন্ধ্যার দিকে আমি রাধানগর এলাকা ঘিরে অবস্থানগত সবক'টি এমএফ (মুক্তিফৌজ) ও এফএফ (গণবাহিনী) কোম্পানিকে যার যার সামনের পাকিস্তানিদের অবস্থানগুলোর ওপর আক্রমণ চালিয়ে দখল করার নির্দেশ দিই। তাই সন্ধ্যার পরপরই পুরো এলাকা ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। পাকিস্তানিরা গভীর রাতে তাদের সীমান্তবর্তী শত্রুঘাঁটি রাধানগর অবস্থান ছেড়ে গোয়াইনঘাট থানা সদরে পালিয়ে যায়। ৩০ নভেম্বর সকালের মধ্যেই পুরো তামাবিল-ডাউকি সীমান্তবর্তী এলাকা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়ে যায়।
নোয়াখালী জেলার রামগঞ্জ থানার লক্ষ্মীধরপাড়া গ্রামে ১৯৪২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এস আই এম নূরুন্নবী খান। তিনি ১৯৬৮-৬৯ সালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ইউকসু) সহসভাপতি ছিলেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা হিসেবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে এবং ছাত্রদের ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখেন তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড কার্যকর হওয়ায় ভীষণ আনন্দিত এই সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, 'আমরা যারা জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছি, তাদের কোনো প্রত্যাশা ছিল না। যুদ্ধ করার বিনিময়ে কিছু চাওয়া হলে আমি মনে করি অন্যায় হবে। পাওয়ার জন্য নয়, আমরা যুদ্ধ করেছি দেশকে মুক্ত করতে।'

আগামীকাল :বীরপ্রতীক ইদ্রিস আলীর যুদ্ধকাহিনী

কোষ্টকাঠিন্য সারাবে শীতের ফল

কোষ্টকাঠিন্য সারাবে শীতের ফল

গোটা বিশ্বে কোষ্টকাঠিন্য কিংবা হজমের সমস্যায় অনেকেই ভোগেন। সাম্প্রতিক এক ...

ভিন্নমতের রাজনীতিকদের প্রতি অশ্রদ্ধা নেই: মাশরাফি

ভিন্নমতের রাজনীতিকদের প্রতি অশ্রদ্ধা নেই: মাশরাফি

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা মাশরাফি; এ নিয়ে সম্ভবত কোন ...

প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেন রাজাপাকসে

প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেন রাজাপাকসে

শ্রীলঙ্কায় রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দায়িত্বে গ্রহণের সাত সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ...

আ.লীগের ইশতেহার ঘোষণা মঙ্গলবার

আ.লীগের ইশতেহার ঘোষণা মঙ্গলবার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে অাগমী মঙ্গলবার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা ...

যে গ্রামে দরজা নেই কোন ঘরের

যে গ্রামে দরজা নেই কোন ঘরের

ঘরে জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা, গহনাগাটি নিরাপদ রাখতে মানুষ কত কিছুই না ...

আওয়ামী লীগে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই: নানক

আওয়ামী লীগে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই: নানক

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, আওয়ামী ...

হোর্হে সাম্পাওলি সান্তোসের কোচ

হোর্হে সাম্পাওলি সান্তোসের কোচ

রাশিয়ার কাজান এরিনা কাঁদিয়ে ছেড়েছে হোর্হে সাম্পাওলিকে। তার কোচিং ক্যারিয়ারের ...

ড. কামাল সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন: আ’ লীগ

ড. কামাল সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন: আ’ লীগ

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, জাতীয় ...