ইয়াবা ব্যবসার জন্য বিয়ে!

মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রামে বসতি

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০১৬

রুবেল খান, চট্টগ্রাম ব্যুরো

ইয়াবা ব্যবসার জন্য বিয়ে!

রুপিয়া বেগম

র‌্যাব-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মিয়ানমার থেকে নানা কৌশলে ইয়াবা নিয়ে আসছে মাদক ব্যবসায়ীরা। জলপথে মাছ ধরার ট্রলারে করে কিংবা মাছের ভেতর ঢুকিয়ে আনা হচ্ছে ইয়াবা ট্যাবলেট। স্থলপথে আরও অভিনব পন্থায় আনা হচ্ছে ইয়াবা। কেউ জুতার ভেতর, কেউ সুপারির ভেতর, কেউ কাঁঠালের ভেতর, আবার কেউ নিজের পায়ুপথে ঢুকিয়েও ইয়াবা এনে জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
এবার ইয়াবা ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে মাদক ব্যবসায়ীরা ভিন্ন এক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। ভিন্ন এই কৌশলের অংশ হিসেবে মিয়ানমারের অনেক মাদক ব্যবসায়ী ইয়াবা ব্যবসার জন্য চট্টগ্রামে এসে বিয়ে করে বসতি গড়ে তুলেছে! ১৫ দিনের ব্যবধানে পৃথক অভিযানে চট্টগ্রামে বিয়ে করে বসতি স্থাপন করা মিয়ানমারের দুই নাগরিককে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ গ্রেফতারের পর এ নিয়ে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বেশ ভাবিয়ে তুলেছে মিয়ানমারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের এই ব্যতিক্রমী কৌশলটি। কারণ, এদেশের মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় র‌্যাব-পুলিশের পক্ষে তাদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, 'এদেশের মানুষের
সঙ্গে মিশে যাওয়ায় মিয়ানমারের ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আলাদাভাবে শনাক্ত করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ, তাদের ভাষা ও চেহারার সঙ্গে এদেশের মানুষের মিল রয়েছে। সেটিকেই তারা ভালোভাবে কাজে লাগাচ্ছে। এর পরও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করছে। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে মামলাও দেওয়া হচ্ছে। যে কৌশলেরই আশ্রয় নেওয়া হোক না কেন, অপরাধ করে কেউ যাতে পার পেয়ে যেতে না পারে, সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।'
গত ২০ ডিসেম্বর গভীর রাতে চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অনন্যা আবাসিক এলাকায় একটি গাড়ি তল্লাশি করে এক লাখ ৮০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দু'জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলো_ সিরাজ (৩২) ও আরাফাত (৩৬)। গ্রেফতারকৃত মাদক ব্যবসায়ী সিরাজ মিয়ানমারের নাগরিক। সে এদেশে বিয়ে করে বেশ কিছু দিন ধরে বসবাস করছিল।
মাদক ব্যবসার সম্প্রসারণে সে এদেশের বিভিন্ন এলাকায় তার একাধিক ঠিকানাও ব্যবহার করত। গ্রেফতার হওয়া আরাফাত তার গাড়িচালক। আরাফাতের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকায়। এই মাদক পাচারের কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়িও (চট্ট মেট্রো-গ-১১-১২৮৫) আটক করে বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ। এ প্রসঙ্গে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন সমকালকে বলেন, 'গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নগরীর অক্সিজেন-কুয়াইশ সংযোগ সড়কের অনন্যা আবাসিক এলাকায় একটি গাড়ি তল্লাশি করা হয়। ওই গাড়ি তল্লাশি করে বস্তাভর্তি বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী মিয়ানমারের নাগরিক সিরাজ ও তার গাড়িচালক আরাফাতকে গ্রেফতার করা হয়। আটককৃত ইয়াবার পরিমাণ এক লাখ ৮০ হাজার পিস। ইয়াবাগুলো আনোয়ারা উপজেলার পারকির চর এলাকা থেকে হাটহাজারীতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'মাদক ব্যবসায়ী সিরাজ মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে বেশ কিছু দিন ধরে এ দেশে মাদক ব্যবসা করে আসছিল। সে মাদক ব্যবসায়ী শক্তিশালী সিন্ডিকেটেরও সদস্য। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে সে এদেশে বিভিন্ন ঠিকানা ব্যবহার করত। মাদক ব্যবসার সুবিধার্থে সে এদেশে বিয়ে করে বেশ কিছু দিন ধরে বসবাস করে আসছিল। তার মতো যারা এভাবে চট্টগ্রামে বিয়ে করে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।'
এদিকে, নগরীর চান্দগাঁও থানার অভিজাত আবাসিক এলাকার এ-ব্লকের একটি বাসায় গত ৩ জানুয়ারি দুপুরে অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ এক নারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার নাম রুপিয়া বেগম (২৫)। তার কাছ থেকে এক হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। সে সঙ্গে ইয়াবা বিক্রির দুই লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয় তার বাসা থেকে। এ প্রসঙ্গে চান্দগাঁও থানার ওসি সৈয়দ আবু মো. শাহজাহান কবির সমকালকে বলেন, 'রুপিয়া ও তার স্বামী ওসমান বেশ কিছুদিন ধরে নগরীতে ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছিল। ওসমান পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। অভিযানে গিয়ে ওসমানকে পাওয়া যায়নি। তবে রুপিয়াকে ১ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত রুপিয়া মিয়ানমারের নাগরিক। অবাধে ইয়াবা ব্যবসা করার জন্যই সে রাঙ্গুনিয়ার ওসমানকে বিয়ে করে চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও এলাকায় বসতি স্থাপন করে। ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় রুপিয়া বেগম ও তার স্বামী ওসমানের বিরুদ্ধে চান্দগাঁও থানায় একটি মাদকের মামলা রুজু করা হয়েছে।'