ডুবুরি আশরাফের নীরব বিপ্লব

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

সেলিম সরদার, ঈশ্বরদী

দেশের নদ-নদী, খাল-বিল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে অনন্য স্বাদের মাছ চিতল। সেই দেশি চিতল মাছের জাত বাঁচাতে রীতিমতো দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছেন ঈশ্বরদীর আশরাফ আলী খান নামের এক অপেশাদার ডুবুরি। ৪০ বছর ধরে এই মানুষটি তার নিজস্ব চিন্তায় উদ্ভাবিত উপায়ে চিতল মাছের ডিম ও রেণু পোনা সংগ্রহ করছেন এবং তা দিয়ে পদ্মার বিশাল জলরাশির মধ্যেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন চিতলের অভয়াশ্রম। মাছ রক্ষার এই নীরব বিপ্লবের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেয়েছেন এ ডুবুরি। গত বছর জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে দেশের শ্রেষ্ঠ মৎস্যজীবী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণপদক দিয়েছেন, সঙ্গে ৫০ হাজার টাকাও।
সরেজমিন পদ্মা নদী ঘুরে ও এলাকার মৎস্যজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈশ্বরদীর সাঁড়া এলাকার বাসিন্দা ডুবুরি আশরাফ পদ্মা নদীর বিলুপ্তপ্রায় চিতল মাছ রক্ষা ও মাছটির বংশ বিস্তারে কাজ করার জন্য এলাকার

সবাই তাকে 'ডুবুরি চিতল' বলে এক নামে চেনে। সাঁড়া এলাকায় পদ্মা নদীতে শতাধিক বাঁশ ও কঞ্চি ফেলে মাছের জন্য বিশাল অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছেন আশরাফ।
ডুবুরি আশরাফ জানান, বাঁশ ও কঞ্চি দিয়ে তার গড়া অভয়াশ্রমে পানির নিচে বিশেষ কায়দায় টিনের বড় বড় ড্রাম রেখে আসেন তিনি। মা চিতল মাছ যখন ওই ড্রামে আশ্রয় নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে ডিম ছাড়ে, তখন আশরাফ যত্নের সঙ্গে ওই ডিম তুলে এনে পানির নিচেই আরেকটি নিরাপদ স্থানে রেখে ডিম থেকে বাচ্চা ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। বাচ্চা ফুটে গেলে তিনি ওই পোনা বিভিন্ন নদ-নদী ও পুকুরে ছেড়ে দেন। এক সময় এসব বাচ্চাই বড় বড় চিতল হয়ে নদীতে মিশে যায় অন্য মাছের সঙ্গে।
আশরাফ বলেন, নদীতে মাছের জন্য কোনো স্থানই নিরাপদ নয়। যে কোনো সময় জেলের হাতে ধরা পড়ার ভয় থাকে মাছের, সে কারণে তিনি মাছ বাঁচাতে নিজস্ব্ব চিন্তা থেকে এই অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছেন। তিনি নিজে কিংবা অন্য কোনো জেলে পদ্মা নদীতে মাছ ধরলেও এই অভয়াশ্রমের ধারেকাছে আসে না কেউ। মৎস্যজীবী বুদ্ধিস্বর হালদার, আবুল কাশেম, মোকছেদ আলীসহ এলাকাবাসী জানান, তারা
কেউ ডুবুরি আশরাফের অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ ধরেন না।
স্থানীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি আনছারুল ইসলাম বলেন, আশরাফ আলীর মতো একজন সাধারণ মৎস্যজীবী ও ডুবুরির এ উদ্যোগ এলাকায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।
ঈশ্বরদী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য অফিসার মো. সাইফুদ্দিন ইয়াহিয়া জানান, ডুবুরি আশরাফের এ উদ্যোগের কথা শুনে মৎস্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা পদ্মা নদীতে তার অভয়াশ্রম পরিদর্শন করেছেন।
ডুবুরি আশরাফের এই অভয়াশ্রম সম্পর্কে স্থানীয় সাংসদ ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ বলেন, মাছের বংশ বৃদ্ধি করতে একজন সাধারণ মৎস্যজীবী হিসেবে আশরাফের এই উদ্যোগ বিরল ঘটনা। আশরাফের এ উদ্যোগকে একটি স্থায়ী অভয়াশ্রম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মৎস্য বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।