উচ্চ আদালতে উপেক্ষিত বাংলা

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

আবু সালেহ রনি

পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ভাষাকেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। আর ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিই বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের; কিন্তু এ দেশের উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনও উপেক্ষিত। যদিও সংবিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, 'প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা।' সুপ্রিম কোর্টের রুলসেও আদালতের ভাষা হিসেবে প্রথমে বাংলা এবং পরে অন্য ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে; কিন্তু এর পরও উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারে কার্যকর উদ্যোগ নেই সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের। কয়েকজন বিচারপতি ব্যক্তিগত আগ্রহে বাংলায় কয়েকটি রায় দিলেও এর সংখ্যা হাতেগোনা। অথচ সদিচ্ছা থাকলে যে-কোনো সময় উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে এর ব্যবহার শুরু করা সম্ভব। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পর একাত্তরের ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় বাংলা একাডেমির একুশে অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, 'আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে।' এরই ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সরকার সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের ভাষা হিসেবে বাংলা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেন। সংবিধানের এ বিধান যথাযথভাবে কার্যকর করতে ১৯৮৭ সালের ৮ মার্চ বাংলা ভাষা প্রচলন আইনও প্রণয়ন করা হয়। আইনের ৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, 'আইন-আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হইবে। যদি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এই আইন অমান্য করেন, তাহা হইলে উক্ত কার্যের জন্য তিনি সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধির অধীনে অসদাচরণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন এবং তাহার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা ও আপিল বিধি অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।' এ আইন অনুসারে দেশের

নিম্ন আদালতে রায় লেখা, শুনানিসহ সব কার্যক্রম বাংলায় হয়; কিন্তু উচ্চ আদালতে তা অনুসরণ করা হয় না। বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক প্রতিনিধিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সভা-সেমিনার থেকে উচ্চ আদালতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারের দাবি করে আসছেন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের ভূমিকা :এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বলছেন, 'সংবিধান অনুসারে বিচারপতিরা স্বাধীন। রায় লেখা বা বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি বিচারপতির এখতিয়ার। তাদের সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে নির্দেশ দেওয়া সমীচীন নয়।' তিনি বলেন, 'অনেক বিচারপতিই বাংলায় রায় দিয়েছেন। তারা চাইলে অবশ্যই বাংলায় রায় দিতে পারেন। আইনগত কোনো বাধা নেই।' সুপ্রিম কোর্ট রুলস সংশোধন করে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি-না, জানতে চাইলে রেজিস্টার জেনারেল বলেন, 'বিচারপতিরাই আলোচনা করে রুলস প্রণয়ন করেন। এটা তাদের বিষয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কিছু করার নেই।'
বাংলায় আদেশ ও রায় :উচ্চ আদালতে বিচারপতিদের মধ্যে প্রয়াত সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও বিচারপতি এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ভাষায় কয়েকটি আদেশ ও রায় দিয়েছিলেন; কিন্তু সেগুলো আইন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত আইন সাময়িকীর (ঢাকা ল' রিপোর্টস ৫০ ও ৫১ ডিএলআর) তথ্যানুসারে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ও বিচারপতি হামিদুল হক সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ নজরুল ইসলাম বনাম রাষ্ট্র মামলায় বাংলায় রায় দিয়েছিলেন। একই সময়ে বিচারপতি হামিদুল হক অন্য একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায়ও বাংলায় রায় দেন। এ ছাড়া হাবিবুর রহমান বনাম সেরাজুল ইসলাম, সবুর আলী বনাম রাষ্ট্র এবং আবদুর রেজ্জাক বনাম রাষ্ট্র নামক তিনটি ফৌজদারি মামলায়ও বিচারপতি কাজী এবাদুল হক বাংলায় রায় দিয়েছিলেন। এ রায়ে ফৌজদারি মামলায় পুলিশের সাক্ষ্য কখন বিশ্বাসযোগ্য বলে গ্রহণ করা যাবে, তা ব্যাখ্যা করা হয়।
বাংলা ভাষায় রায় দিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তিনি বিচারপতি হিসেবে হাইকোর্টে থাকার সময় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানসহ স্থাপনা সংরক্ষণ, স্বাধীনতার ঘোষক, ঢাকার চার নদী রক্ষাসহ প্রায় দেড়শ' উল্লেখযোগ্য মামলার রায় বাংলায় দেন। তবে এখন বাংলায় পূর্ণাঙ্গ রায় দেওয়ার বিষয়টি একপ্রকার উপেক্ষিত। আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নির্দেশনা চেয়ে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট করেন আইনজীবী ড. ইউনুস আলী আকন্দ। ওই রিটে একই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি রুল জারি করেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। কিন্তু এখনও ওই রুলের চূড়ান্ত শুনানি না হওয়ায় বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৯ জন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৯৩ জন বিচারপতি রয়েছেন।
এর আগে ১৯৯১ সালে ভাষা নিয়ে হাইকোর্টের এক রায়ে বলা হয়, ভাষা তিন প্রকার। রাষ্ট্রভাষা, সরকারের ভাষা ও আদালতের ভাষা। রাষ্ট্রভাষার অর্থ, যে ভাষা রাষ্ট্রের সব কাজে ব্যবহৃত হয়। সরকারের ভাষা হলো নির্বাহী কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা এবং আদালতের ভাষার অর্থ বিচারিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত ভাষা। অবশ্য ওই রায়ে ইংরেজির ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়নি। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা আইনে আদালতে রাষ্ট্রভাষা ছাড়া অন্য কোনো ভাষার প্রচলন রদ করে কোনো বিধান যোগ হয়নি। উন্নত বিশ্বে বিচারপ্রার্থীদের শুনানি ও রায় বুঝতে পারার জন্য উচ্চ আদালতে দাপ্তরিক কাজসহ আদালতের রায় ও আদেশ চলে রাষ্ট্রের নিজস্ব ভাষায়। এর মধ্যে জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চ আদালতে বিচারকাজ চলে তাদের মাতৃভাষায়।
আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম সমকালকে বলেন, 'সংবিধানের আলোকে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করা হয়েছে; কিন্তু ওই আইন অনুযায়ী আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়নি। এ কারণে কমিশন থেকে ২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।' হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, 'উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা ব্যবহারে আইনগত বাধা নেই। এর পরও উচ্চ আদালতে কেন বাংলা ভাষার ব্যবহার সর্বস্তরের হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়।'
হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, 'সংবিধান ও আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষাকে প্রাধান্য দিলে সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের ইচ্ছা পূরণ হবে।'
কর্মসূচি :রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে 'উচ্চ আদালতে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা কার্যকরকরণ' বিষয়ে আজ শুক্রবার সকাল ১০টায় এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। বেসরকারি সংগঠন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে থাকবেন ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া। সভায় আলোচক হিসেবে ভাষাসংগ্রামী আহমেদ রফিক, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ও আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম প্রমুখের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।