আওয়ামী লীগে অভিযোগের শেষ নেই তৃণমূলের

প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬     আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

অমরেশ রায়


ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ক্ষোভের যেন শেষ নেই। প্রতিদিনই নেতাকর্মীরা ঢাকায় ছুটে আসছেন নতুন নতুন অভিযোগ নিয়ে। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে দিচ্ছেন লিখিত অভিযোগপত্র। আর দল মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তৃণমূলের অভিযোগের পাহাড় সামাল দিতে রীতিমতো গলদঘর্ম মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত ক্ষমতাসীন দলটির



কেন্দ্রীয় নেতারা।

আগামী ২২ মার্চ অনুষ্ঠেয় ৭৩৯টি ইউনিয়নের নির্বাচনে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত বেশিরভাগ ইউনিয়নে মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে দলীয় প্রত্যয়নপত্র নিয়ে অনেকেই এলাকায় ছুটছেন মনোনয়নপত্র জমা দিতে। তবে প্রার্থী ঘোষণার এ কাজ যত এগুচ্ছে, এ নিয়ে তৃণমূল নেতাদের অভিযোগও যেন ততই বাড়ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে। সেখানে জমা পড়ছে অসংখ্য লিখিত অভিযোগপত্র। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছেও ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে অভিযোগ।

দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে জমজমাট হয়ে উঠেছে ধানমণ্ডির কার্যালয়টি। গতকাল শুক্রবারও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এ কার্যালয়সহ আশপাশের এলাকা দলীয় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে মুখর ছিল।

তৃণমূল নেতাকর্মীসহ মনোনয়নবঞ্চিতদের অভিযোগ, যে প্রক্রিয়ায় প্রার্থী চূড়ান্ত করার কথা ছিল, সে প্রক্রিয়ায় কার্যক্রম এগুচ্ছে না। মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে স্থানীয় দলীয় এমপিদের সম্পূর্ণভাবে বাইরে রাখার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় তাদের হস্তক্ষেপে 'পছন্দের প্রার্থীদের' নামই কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এমন অভিযোগ থেকে মুক্ত নন দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা-উপজেলার প্রভাবশালী নেতারা, ক্ষেত্র বিশেষে স্থানীয় মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর দু'একজন উপদেষ্টাও।

বিএনপি ও জামায়াত থেকে সদ্য দলে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি 'রাজাকারের সন্তান' এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িতরাও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন- এমন অভিযোগও তুলেছেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। কোথাও কোথাও 'মনোনয়ন বাণিজ্যের' অভিযোগও উঠতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।

খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন মো. মহসিন। অথচ তৃণমূলের প্রার্থী বাছাইয়ের ভোটাভুটিতে মহসিন ২০ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামালের কাছে। উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি এফএম অহিদুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক কেএম আলমগীর তৃণমূলের ভোটে বিজয়ী কাজী কামালকে দলীয় প্রার্থী করার দাবি জানিয়ে লিখিত অভিযোগপত্র দিয়েছেন। ধানমণ্ডি কার্যালয়ের সামনে গতকাল কাজী কামাল সমকালকে বলেন, 'প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা ও তার স্ত্রীকে বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে মহসিন দলীয় মনোনয়ন পেয়ে গেছেন।' দলীয় সিদ্ধান্ত বদল না হলে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকবেন বলেও জানান তিনি।

একই উপজেলার সাচিয়াদহ ইউনিয়নের দলীয় প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান এবিএম আলমগীর শিকদারের বিরুদ্ধে এসেছে গুরুতর অভিযোগ। 'বিএনপি সমর্থক' হিসেবে গত নির্বাচনে বিজয়ী হলেও এবার হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে যুবলীগ নেতা হত্যা, সরকারি গাছ চুরি এবং সরকারি বরাদ্দের চাল চুরির অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে স্থানীয় থানায়। তার বদলে 'তৃণমূলের কাছে গ্রহণযোগ্য' ও ত্যাগী নেতা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা উকিল উদ্দিন লস্করকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার কাছে চিঠি দিয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন 'নব্য আওয়ামী লীগার' ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আ স ম আবদুল কাইয়ুম খোকা। তার বাবা মরহুম আবদুল ওহাব মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্থানীয় শান্তি কমিটির সভাপতি হিসেবে এলাকায় গণহত্যাসহ অনেক অপরাধে জড়িত ছিলেন- এমন লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধা নেতারা। খোকা ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা বিএনপির সময় এমনকি বর্তমান সরকারের সময় অনেক অপকর্মের মাধ্যমে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন- এমন অভিযোগও জানিয়েছেন তারা। তার বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় মামলা থাকাসহ নানা অভিযোগ জানিয়ে এমনকি তাকে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে গত মাসে জেলা আওয়ামী লীগে চিঠি পাঠিয়েছিলেন স্থানীয় নেতারা।

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নে মনোনয়নপ্রত্যাশী আনোয়ার হোসেন শিকদারের অভিযোগ, এ ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের বেলায় পটুয়াখালী-৪ আসনের এমপি মাহবুবুর রহমান তালুকদার অর্থ লেনদেনের পাশাপাশি প্রভাব বিস্তার করেছেন। এখানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন নাসির উদ্দিন মাহমুদ। দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে দেওয়া লিখিত অভিযোগপত্রে আনোয়ার হোসেন শিকদার আরও অভিযোগ করেন, পাশিপাশি দুই উপজেলার আটটি ইউনিয়নের প্রতিটিতেই দলীয় এমপি একই কাজ করেছেন।

বাগেরটহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার চারটি ইউনিয়নের তৃণমূল মনোনীত প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি জামাল উদ্দিন আকন্দ লিখিত অভিযোগ করেছেন, যোগ্য প্রার্থীদের নাম ও প্রাপ্ত ভোট সংবলিত কাগজ জমা দেওয়া হলেও জেলা নেতারা অন্যদের নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন।

অবশ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূল নেতা ও মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের এতসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, ইউপি নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত ও রাজাকারদের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সত্য নয়। আওয়ামী লীগ ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় কোনো বিএনপি-জামায়াত ও রাজাকারের নাম নেই। সমাজবিরোধী কাউকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে- এমন প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে- এমনটি দাবি করেছেন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির অন্যতম এই নেতা।