মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহ অস্ত্র যাচ্ছে পুলিশ জাদুঘরে

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০১৬

ইন্দ্রজিৎ সরকার

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। ২৫ মার্চের কালরাতে রাজারবাগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ট্যাঙ্ক, কামান ও ভারী মেশিনগানের মতো অস্ত্রের সামনে সামান্য থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে লড়াই করেছেন অকুতোভয় পুলিশ সদস্যরা। পরের নয় মাসেও তারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়ে গেছেন সমান তালে। তাই সে সময় পুলিশের ব্যবহৃত থ্রি নট থ্রি, স্টেনগান, এলএমজি, এসএমজিসহ অন্যান্য অস্ত্র ও সরঞ্জাম ঠাঁই পাচ্ছে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। মূলত রাজারবাগের বর্তমান জাদুঘরটিই এসব অস্ত্র-সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে আরও বড় পরিসরে যাত্রা শুরু করবে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী ২৩ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই জাদুঘরের নবযাত্রার উদ্বোধন করবেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (ইকুইপমেন্ট) কামরুল আহসান জানান, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবহ পুলিশের অস্ত্র-গোলাবারুদ, পোশাক, মেডেল ও সনদসহ অন্যান্য সরঞ্জাম এ জাদুঘরে রাখা হবে। এ জন্য সারাদেশে পুলিশের সব ইউনিটে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সংরক্ষণে থাকা নিদর্শনগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব জিনিসের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সবার জানার সুবিধার্থেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, অনেক পুরনো মডেলের থ্রি নট থ্রি রাইফেল পুলিশ আর এখন ব্যবহার করে না। তবে পুলিশের অস্ত্রাগারে এগুলো এখনো সংরক্ষিত রয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনে আনসার বাহিনীর সদস্যদের মাঝে মধ্যে এসব রাইফেল ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। পরে
আবারও তা অস্ত্রাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এরমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত থ্রি নট থ্রি রাইফেলগুলো আলাদা করে জাদুঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বোল্ট অ্যাকশন মডেলের এ রাইফেলের পোশাকি নাম লি এনফিল্ড। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এ রাইফেলের কার্তুজ পয়েন্ট ৩০৩ ইঞ্চি বোরের।
এ ছাড়া জাদুঘরে অন্যান্য অস্ত্রের মধ্যে থাকবে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত স্টেনগান। ২০ রাউন্ড গুলির ম্যাগাজিনের এই অস্ত্রটি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় তৈরি অস্ত্রটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়। মুক্তিযুদ্ধে বহুল ব্যবহৃত আরেকটি আগ্নেয়াস্ত্র ছিল স্টারলিং সাব মেশিনগান বা এসএমজি। যুক্তরাজ্যে নির্মিত ও ভারতে সংযোজিত অস্ত্রটি দেখতে অনেকটা স্টেনগানের মতোই। স্বল্প দূরত্বে গুলি ছোড়ার জন্য খুবই কার্যকর অস্ত্রটির ম্যাগাজিনে ৩০ রাউন্ড গুলি থাকে। মুক্তিযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর ব্যবহার করা অন্যতম অস্ত্র ছিল এসএলআর বা সেলফ লোডিং কমব্যাট রাইফেল। সেমি অটোমেটিক রাইফেলটির বুলেট কার্টিজ সাত পয়েন্ট ৬২ মিলিমিটার। এর ম্যাগাজিনে থাকে ২০ রাউন্ড গুলি। চেকোস্লোভাকিয়ার নকশা করা ও যুক্তরাজ্যে তৈরি এলএমজি ছিল মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি প্রধান অস্ত্র। এটি ব্রেনগান নামেও বহুল পরিচিত। এর বুলেট কার্টিজ থ্রি নট থ্রি রাইফেলের মতোই। ম্যাগাজিনে গুলির ধারণক্ষমতা ৩০ রাউন্ড। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী ইপিআরের কাছ থেকে। সম্মুখযুদ্ধে এ অস্ত্রের বহুল ব্যবহার হয়। এইচএমজি এম-২ নামে রাশিয়ার ব্রাউনিং কোম্পানির নকশা করা অস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়। এই ভারী মেশিনগানের ৩০ মিলিমিটার বুলেট ট্যাঙ্কের শক্ত কাঠামো ভেদ করতে সক্ষম। চেইনলোডেড কার্তুজ ফিডের এই অস্ত্রটি মুক্তিযুদ্ধের সময় নিয়মিত সৈন্যরা ব্যবহার করেছিলেন। এটি বিমান ধ্বংসকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো।
মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত আরও দুটি অস্ত্র হলো কালাসনিকভ ও ডেগট্রায়ভ আরপিডি টাইপ ৫৬ এলএমজি। রাশিয়ার নকশা নকল করে চীনে এগুলো তৈরি হয়। এগুলো মূলত পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যবহার করত। পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী সৈনিকদের মাধ্যমে তা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে। কালাসনিকভ একে-৪৭-এর বাঁকানো ম্যাগাজিনে ৪০ রাউন্ড এবং ৫৬ এলএমজির ড্রাম টাইপ ম্যাগাজিনে ১০০ রাউন্ড গুলি থাকে।
সূত্র জানায়, অস্ত্র-গোলাবারুদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া পুলিশ সদস্যদের ব্যবহৃত পোশাক, তাদের অর্জিত মেডেল, সনদ ও যুদ্ধের স্মৃতিবহ নানা সরঞ্জাম জাদুঘরে ঠাঁই পাবে। জানুয়ারিতে উদ্বোধনের পর সাধারণ মানুষ নির্ধারিত সময়সূচিতে এসব দেখার সুযোগ পাবেন।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাজারবাগে পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধন করা হয়। সে সময় দুটি কক্ষে স্বল্প পরিসরে এটির যাত্রা শুরু হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত থ্রি নট থ্রি রাইফেল ছাড়াও রয়েছে একনলা ও দোনলা বন্দুক, এলএমজি, এসএমজি, বেটা গান, মর্টার শেল, বেতের তৈরি ঢাল, হেলমেট ইত্যাদি। সংশ্লিষ্টরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী অনেক অস্ত্র তাদের সংগ্রহে থাকলেও স্থান সংকটের কারণে আপাতত তার ১০টি প্রদর্শন করা হচ্ছে।