রেকর্ড নারীকর্মী অভিবাসন

প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬

রাজীব আহাম্মদ

বিদেশে কাজ করতে যাওয়া নারীকর্মীর সংখ্যা ২০১৫ সালেই লাখ ছাড়িয়েছিল। ২০১৬ সালে এ সংখ্যা আগের বছরকেও ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত রেকর্ডসংখ্যক এক লাখ আট হাজার ৭৬৯ নারীশ্রমিক অভিবাসী হয়েছেন। বছর শেষে এ সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২০ হাজার হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে রেকর্ড। ২০১৫ সালে এক লাখ তিন হাজার ৭১৮ নারী চাকরি করতে বিদেশ যান। কর্মসংস্থানের জন্য নারীর বিদেশযাত্রা বেড়েছে আগের বছরের চেয়ে ১০ শতাংশের বেশি।
এ সংখ্যা আরও বেশি হতো; তবে পুরুষকর্মীদের বিদেশ পাঠাতে সরকার যত তৎপর, নারীর বেলায় ততটা নয়। খোদ প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসিও তা স্বীকার করেন। রক্ষণশীল সমাজ ও পরিবারের বিরোধিতা ও চাপ তো আছেই, প্রবাসে নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই কাজ করার জন্য নারীদের বিদেশযাত্রার পক্ষপাতী নন। ইচ্ছা থাকলেও অনেক নারী পারিবারিক বিরোধিতার কারণে বিদেশ যেতে পারেন না। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশি নারী গৃহস্থ কর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটায় এমন ভয়ের ভিত্তিও রয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় জানাচ্ছে, পরিস্থিতি আগের মতো নেই- নারীদের জন্য বিদেশে কাজের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক নিরাপদ।
প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি সমকালকে বলেন, 'সরকার নারীদের নিরাপদ অভিবাসন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে অনেক উদ্যোগ নিয়েছে। নারী নিপীড়ন রোধে হটলাইন ও সহায়তা সেবা চালু করা হয়েছে। নারীকর্মীদের জন্য বিনামূল্যে দেশে যোগাযোগের সুযোগ চালু করা করেছে। নির্যাতনের ঘটনাও অনেক কমে এসেছে।'
অভিবাসী নারীকর্মীদের সংগঠন বমসার পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম সমকালকে বলেন, 'নারী বিদেশে কাজ করতে গেলে এখনও তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। নারীর প্রতি অবমাননা রোধ করা গেলে ও প্রবাসে নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত
করতে পারলে নারী আরও এগিয়ে যাবে।'
জনশক্তি খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরবের শ্রমবাজার খুলে যাওয়ার কারণেই নারীকর্মীদের বিদেশযাত্রার এমন ঊর্ধ্বগতি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৬২ হাজার ৯১৬ নারীকর্মী সৌদি আরব কাজ করতে গেছেন। একই সময়ে জর্ডান গেছেন ২০ হাজার ৭৬৩ জন, ওমান গেছেন ১১ হাজার ৮৭৫ জন।
২০১৪ সালে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন মাত্র ১৩ নারীকর্মী। গত বছর দেশটির শ্রম খাত বাংলাদেশি নারীকর্মীদের জন্য উন্মুক্ত হয়। ওই বছর ২০ হাজার ৯৫২ বাংলাদেশি নারীকর্মী সেখানে যান। সৌদি আরবে পুরুষকর্মীদের জন্য সরকার নির্ধারিত ব্যয় এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা; তবে ছয় থেকে আট লাখ টাকার কমে কর্মীরা কেউই যেতে পারেন না। নারীরা যান প্রায় বিনা খরচে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের অভিবাসনবিষয়ক সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার সারওয়াত বিনতে ইসলাম বলেন, 'পুরুষকর্মীরা প্রায় আট লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরব যান। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও অভিবাসন ব্যয় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা। তাদের অভিবাসন আট-নয় মাসের বেতনের চেয়েও বেশি। এ কারণে প্রবাসী পুরুষকর্মীরা পরিবারের জন্য যতটা ভূমিকা রাখতে পারেন, নারীরা তার চেয়ে বেশি রাখেন। কারণ, তারা প্রায় বিনা খরচে যাচ্ছেন।
নারীকর্মীদের অভিবাসনপ্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯৯১ সালে। ওই বছর দুই হাজার ১৮৯ কর্মী বিভিন্ন দেশে যান। পরবর্তী ১০ বছরে কমতে থাকে নারীদের বিদেশ যাওয়া। ২০০০ সালে মাত্র ৪৫৪ নারী কাজ নিয়ে বিদেশ যান। ২০০১ সাল থেকে বিদেশের শ্রমবাজার নারীদের জন্য খুলতে শুরু করে। উত্থানের শুরু ২০০৪ সাল থেকে। ওই বছর ১১ হাজার ২৫৯ নারীকর্মী মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে যান। ২০০৯ ও ২০১০ সালে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাত গভীর সংকটে পড়লেও নারীকর্মীর অভিবাসন অব্যাহত থাকে। ২০০৯ সালে মোট জনশক্তি রফতানি প্রায় ৪৫ শতাংশ কমলেও নারীকর্মীদের বিদেশযাত্রা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়েছে।
পরের বছরগুলোতে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় শ্রমবাজার। চলতি বছরের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশ গেছেন সাত লাখ ৩৫ হাজার ৪৭৬ বাংলাদেশি কর্মী। এর প্রায় ১৮ ভাগ নারীকর্মী। ২০০৯ সালে মোট রফতানির মাত্র ৪ দশমিক ৬৭ ভাগ ছিলেন নারী। ২০০৮ সালে ছিল দুই ভাগেরও কম। এর আগের বছরগুলোতে ছিল ১ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ প্রতিবছরই বাড়ছে নারীর অভিবাসন, বাড়ছে জনশক্তি খাতে তাদের অবদান।