ডাক জাদুঘরের বাঁকে বাঁকে ইতিহাসের স্মারক

মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রহশালা

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০১৭

রাশেদ মেহেদী

বিশ্বের ইতিহাসে এক নারকীয় গণহত্যার রাত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ। ওই কালরাতে শত সহস্র নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করেছিল পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। সম্প্রতি ইতিহাসের এই কালো দিনকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। ভয়াবহ এই গণহত্যার স্মারক; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। তারই অংশ হিসেবে এবার '৭১-এর গণহত্যার চিত্র নিয়ে একসঙ্গে ৭১টি ডাকটিকিট প্রকাশ করতে যাচ্ছে ডাক বিভাগ। আশা করা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে এসব ডাকটিকিট অবমুক্ত করবেন। ডাক বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে ডাকটিকিটগুলো প্রকাশের যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। এখন অপেক্ষা প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের।
একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে ডাক বিভাগের এ উদ্যোগ নতুন কিছু নয়। অনেকটা নিভৃতে পড়ে থাকলেও ডাক জাদুঘরে ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা অধ্যায়ের স্মারকচিহ্ন সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ পাওয়া ডাকটিকিট। যে কেউ ডাক
জাদুঘর পরিদর্শন করলে দেখতে পাবেন ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে চলমান সময় পর্যন্ত ইতিহাসের নানা বাঁক। সংরক্ষিত সেসব ডাকটিকিটের গায়ে উদ্ভাসিত হয়ে আছে ইতিহাসের টুকরো টুকরো নিদর্শন। ডাক বিভাগের মহাপরিচালক সুশান্ত কুমার মণ্ডল সমকালকে জানান, এই জাদুঘরকে নতুন আঙ্গিকে সজ্জিত করে জনগণের আরও নিকটে নিয়ে আসা হচ্ছে। জিপিও'র নিচতলনায় বড় পরিসরে দুই স্তরে গ্যালারি নির্মাণের মাধ্যমে ডাক জাদুঘর সাজবে নতুন সাজে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
টিকিটের বুকে কথা বলে ইতিহাস :জানা না থাকলে হঠাৎ করে এই ডাক জাদুঘর খুঁজে পাওয়া একটু মুশকিল। ঢাকার জিপিও ভবনের তিন তলায় উঠে লম্বা করিডোর পার হয়ে একেবারে শেষ প্রান্তে গেলে চোখে পড়বে একটি ছোট সাইনবোর্ড, 'পোস্টাল মিউজিয়াম'। এর উল্টো পাশেই আরেকটি সাইনবোর্ড 'স্ট্যাম্প শাখা'। এ স্ট্যাম্প শাখাই মূলত ইতিহাসের চিহ্নগুলো বুকে ধারণ করে রেখেছে। সেখানে প্রবেশ করলে প্রথমেই নজরে পড়বে বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত ডাকটিকিট। তারপর জাতীয় চার নেতার ছবি সংবলিত ডাকটিকিট, বীরশ্রেষ্ঠদের নামে স্মারক ডাকটিকিট, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আসাদের নামে স্মারক ডাকটিকিট। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের শহীদ ডা. মিলনের নামে স্মারক ডাকটিকিটসহ কয়েকশ' টিকিটে বাঙালির ইতিহাস বহন করে চলেছে।
পাশপাশি এই জাদুঘরে বিশ্বের প্রায় সব দেশের ডাকটিকিট সংরক্ষিত আছে। দেখা যাবে ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান সময় পর্বে এই উপমহাদেশে ডাকটিকিটের ক্রমবিবর্তন। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত স্মারক খামগুলো বিশেষ যত্নে সংরক্ষিত আছে এ জাদুঘরে।
আগামী ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে একাত্তরের গণহত্যা নিয়ে প্রকাশিতব্য ৭১টি ডাকটিকিট হয়ে উঠবে এ জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের এক অনবদ্ধ স্মারক।
মিউজিয়ামের কিউরেটর কামরুজ্জামান স্বপন সমকালকে জানান, এই জাদুঘরে ১৯১টি দেশের তিন হাজারের বেশি ডাকটিকিট সংরক্ষিত আছে। আছে ১৮৩০ সালে প্রথম মুদ্রিত ডাকটিকিটের খামও।
রানার ছুটেছে রানার :মূল জাদুঘরে প্রবেশ করলে চোখে ভাসে একজন রানারের ছবি। মনের ভেতরে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য গেয়ে ওঠেন, 'রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে, খবরের বোঝা হাতে'। পুরো গ্যালারি ঘুরে জানা গেল বিশ্বের ডাক বিভাগের ইতিহাসের পাশাপাশি বিশ্বসভ্যতার বিবর্তনের নানা অধ্যায়। দেয়ালে রক্ষিত আছে ডাক বিভাগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের তৈলচিত্র।
কালজয়ী নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র, মহাকবি কায়কোবাদ, ডাকটিকিটের উদ্ভাবক স্যার রোনাল্ড হিল, সিভি রমন, হেনরি ভন স্টিফেন ও মন্টেগোমারির ছবি। আরেকজনের তৈলচিত্র দেখিয়ে জাদুঘরের গাইড আবদুল মালেক জানালেন, এ মানুষটি প্যাকার থেকে নিজ অধ্যবসায়ে পোস্টমাস্টার হয়েছিলেন। তার নাম শেখ সফিউর রহমান।
জাদুঘরে মহারানী ভিক্টোরিয়ার আমলের ৯ মণ ওজনের একটি লেটার বক্স রয়েছে। এ ছাড়া বার্হিংহামে তৈরি ৭ মণ ওজন মাপার একটি স্কেল।
এ ছাড়া পুরনো দিনে রানারদের ব্যবহৃত ব্যাগ, মানি কটব্যাগ, চামড়ার ব্যাগ, লণ্ঠন, ছুরি এবং কুইনাইন ওষুধ সবই রয়েছে। ব্রিটিশ আমলে ডাক হরকরারা প্রায়ই ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতেন। এ জন্য প্রতিটি পোস্ট অফিসে রাখা হতো কুইনাইন। তারও স্মারক রয়েছে জাদুঘরে।
বর্তমানে যারা মধ্য বয়সী, তাদের প্রত্যেকের অভিজ্ঞতায় আছে প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় ডাকপিয়নের আগমন পথে চেয়ে থাকার। কিন্তু কালের বিবর্তনে বর্তমান ডিজিটাল প্রজন্মের কাছে আগেকার দিনের সেই ডাকপিয়ন, চিঠি, অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। এই জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ হলে নতুন প্রজন্ম এখান থেকে জেনে নিতে পারবে মানবসভ্যতাকে টেনে আজকের অবস্থানে পেঁৗছে দিতে ডাক ব্যবস্থার অমূল্য অবদানের কথা।