উন্নয়নের প্রধান শত্রু বাল্যবিয়ে

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০১৭      

সাজিদা ইসলাম পারুল


বাংলাদেশে গ্রামীণ নারীর উন্নয়নের প্রধান অন্তরায় বাল্যবিয়ে। এখনও দেশে মেয়েদের এক-তৃতীয়াংশ ১৫ বছরের আগে এবং দুই-তৃতীয়াংশের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়। গ্রামে এ হার ৭১ এবং শহরে ৫৪ শতাংশ। শিশুবিবাহের কারণেই গ্রামীণ মেয়েদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ। এর সার্বিক প্রভাবে
বাড়ছে নারী-শিশু ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো ঘটনা। বাল্যবিয়ে ঠেকানোয় সফল হওয়া মেয়েদের মতে, নারীর প্রকৃত উন্নয়নে দেশ থেকে বাল্যবিয়ে শব্দটিই মুছে ফেলতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজ রোববার বাংলাদেশে পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। চার বছর ধরে দেশের নারীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে জাতীয়ভাবে গ্রামীণ নারী দিবস-২০১৭-এর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে 'সর্বক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন'। গ্রামীণ নারীদের সর্বক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাসহ ধর্ষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, ধর্ষক ও তার পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কটসহ নারীর সার্বিক অধিকার ও উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুবিবাহ প্রতিরোধ করতে না পারলে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর সমঅধিকার-সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠা ভূলুণ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে সরকার ২০২১ সালে বাল্যবিয়ে ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে যে ঘোষণা দিয়েছে, তা পূরণে ব্যর্থ হবে।
সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ বাল্যবিয়ে হচ্ছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র। বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা সমান। মাধ্যমিক স্তরে ৫৩ শতাংশ, কলেজ পর্যায়ে ৪৭ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় ৩৩ শতাংশ মেয়ে শিক্ষাগ্রহণ করছে। ইউনিসেফের 'উইমেন্স লাইফ চয়েস অ্যান্ড এটিচুডস ২০১৪'-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিয়ে-সংক্রান্ত কারণে ২৪ শতাংশ মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর সরকারের অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে তাদের সংখ্যা ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর পাবলিক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী মিতু মালাকার। সহপাঠীদের সহযোগিতায় নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকায় সে। ঝালকাঠির রাজাপুর পাইলট স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী শারমিন আক্তারও মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করে তার বিয়ে ঠেকাতে সক্ষম হয়। শারমিন আক্তার সমকালকে জানায়, বাংলাদেশে যেন বাল্যবিয়ে শব্দটি না থাকে। অভিভাবকরা যেন মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দেন। তাহলে কোনো মেয়ে অসহায় থাকবে না। অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না।
মাতৃমৃত্যুর হার ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়বে :১৮ বছরের আগে নারীর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হয় না। ফলে এ বয়সে বিয়ে হলে তাদের জন্ম দেওয়া শিশুর ওজন কম হবে, অপুষ্টিতে ভুগবে, সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে শিশু বিকশিত হতে পারবে না। দ্য ইন্টারন্যাশনাল এইড ট্রান্সপারেন্সি ইনিশিয়েটিভের তথ্যমতে, বাংলাদেশে সন্তান প্রসবের সময় প্রতি লাখে ১৭০ জন নারী মারা যান। প্রতি হাজারে ২৪ শতাংশ নবজাতক মারা যায়, নবজাতকের মৃত্যুহারে বিশ্বে এ দেশের অবস্থান ষষ্ঠ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, বাল্যবিয়ের কারণে নারীরা যৌনরোগ, গর্ভকালীন জটিলতা, প্রসবকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি, জরায়ূমুখে ক্যান্সার, ফিস্টুলাসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়।
২০১৭ সালের ২৪ নভেম্বর 'বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৬' শীর্ষক খসড়া বিল মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন করে। এ খসড়া আইনের ১৯ ধারায় মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ রাখা হলেও বিশেষ ক্ষেত্রে মেয়েদের 'সর্বোত্তম স্বার্থে' 'আদালতের নির্দেশে'এবং মা-বাবার সম্মতিতে যে কোনো 'অপ্রাপ্ত বয়স্ক' মেয়ের বিয়ে দেওয়া হবে।
গ্রামীণ নারীদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনের নেতারা বলেন, শিশুবিবাহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তার অধিকারকে খর্ব করে। শিশুর বিয়ে হলে তা নারীবিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনের লগ্ধঘন হয়।
১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের চতুর্থ নারী সম্মেলনে ১৫ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১৯৯৭ সাল থেকে জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওমেন্স ওয়ার্ল্ড সামিট ফাউন্ডেশন গ্রামীণ নারী দিবসটি পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি পালন করে। ১৯৯৮ সাল থেকে বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উদযাপন জাতীয় কমিটির সমন্বয়কারী ফেরদৌস আরা রুমী বলেন, গ্রামে মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের পরপরই বেশিরভাগেরই বিয়ে দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মেয়েরা ঝরে যাচ্ছে। যদি মেয়েদের বিয়ে না দিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠানো নিশ্চিত করা যায়, তবে তাদের জীবন অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতে পারে।
তিনি জানান, চলতি বছর দেশের ৫০টিরও বেশি জেলায় দিবসটি পালন করা হবে। প্রতিটি জেলায় রয়েছে এ সংক্রান্ত জেলা কমিটি। জাতীয় পর্যায়েও দিবসটি ৯-১৫ অক্টোবর পালন করা হচ্ছে নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।