ভোটের হাওয়া: চট্টগ্রাম-৩

টেনশন পিছু ছাড়ছে না মিতা আর কামালের

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০১৮

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম ও ইলিয়াস কামাল বাবু,সন্দ্বীপ

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে আওয়ামী লীগের অর্ধডজন মনোনয়নপ্রার্থীর মধ্যে সুদৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন বর্তমান এমপি মাহফুজুর রহমান মিতা। একইভাবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবেও বলতে গেলে নিশ্চিত সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা। তবুও টেনশন পিছু ছাড়ছে না এ দুই প্রার্থীর। কারণ, তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতেই রয়েছেন আরও প্রায় এক ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী। মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে তারা যদি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করেন, তা হলে সন্দ্বীপে বিজয় ছিনিয়ে আনা হবে তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।

বর্তমান এমপি মাহফুজুর রহমান মিতার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের  মনোনয়ন নিয়ে টানা দুবার এমপি হয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর উত্তরসূরি হিসেবে রাজনীতিতে আসেন মাহফুজুর রহমান মিতা। গত নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে প্রথমবারেই বিজয়ী হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি মনোনয়ন চাইবেন। তবে তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন উপজেলা চেয়ারম্যান ও দলের উপজেলা সভাপতি মাস্টার শাহজাহান বিএ, সাবেক চিকিৎসক নেতা ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী, দলের উত্তর জেলার যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক এবং সন্দ্বীপ পৌরসভার মেয়র জাফর উল্যা টিটু, জেলা পরিষদ সদস্য আফতাব খান অমি, উত্তর জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও মাইটভাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিজান।

একই চিত্র রয়েছে বিএনপিতেও। সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা এবারও ধানের শীষ প্রতীক প্রত্যাশা করছেন। টানা তিনবার নির্বাচিত এই এমপি মনোনয়ন দৌড়ে দলেও এগিয়ে আছেন। তবে তার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছেন অপর দুই মনোনয়নপ্রত্যাশী- দলের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল ও কাতারপ্রবাসী ব্যবসায়ী নুরুল মোস্তফা খোকন।

মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, তার বাবা মোস্তাফিজুর রহমান এ আসনে দুবারের এমপি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্থা রাখায় বাবার উত্তরসূরি হিসেবে তিনিও এমপি হয়েছেন। তিনি ঢাকায় না থেকে সুখ-দুঃখে জনগণের পাশেই আছেন। তা ছাড়া গত চার বছর এলাকায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদনও এনেছেন। এর মধ্যে ১৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সাবমেরিন কেবল স্থাপন, ২৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সন্দ্বীপের চারদিকে ব্লক বেড়িবাঁধ কাম মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ, ১০০ কোটি টাকায় শতাধিক অভ্যন্তরীণ সড়ক সংস্থার, ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ল্যান্ডিং জেটি স্থাপন, ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে হেলথ কমপ্লেক্স প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্থা রাখলে তিনি আগামী নির্বাচনেও নৌকার প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে চান।

তবে নৌকার মনোনয়ন যিনিই পান, বিজয়ী হতে হলে তাকে উপজেলা চেয়ারম্যান মাস্টার শাহজাহান বিএর সমর্থন প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। ভোটারদের ধারণা, ওপর থেকে এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্পর্ক গভীর ও ভালো দেখা গেলেও ভেতরে অন্য চিত্র। তা ছাড়া গত নির্বাচনে মনোনয়ন চাওয়ার ধারাবাহিকতায় এবারও মাস্টার শাহজাহান প্রার্থী হতে আগ্রহী।

মাস্টার শাহজাহান বিএ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গত চার বছরে সন্দ্বীপের যে উন্নয়ন করেছে, তা গত ৪০ বছরেও হয়নি। আর বড় দল হিসেবে অন্যান্য আসনের মতো এ আসনেও একাধিক প্রার্থী নৌকার মনোনয়ন চাইবেন- এটাই স্বাভাবিক। মনোনয়ন চাইবেন জানিয়ে তিনি বলেন, তার দৃঢ়বিশ্বাস, বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় এবং দুঃসময়ে দলীয় নেতাকর্মীদের আগলে রাখায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে মূল্যায়ন করবেন। এর আগে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ মেনে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দিয়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছিলেন বলে জানান তিনি।

ডা. জামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্থা রাখলেও দলের কিছু নেতার বিরোধিতার কারণে তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয় পাননি। তার আশা, দলের কেউ আর এবার সেই ভুল করবেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও আস্থা রাখলে তিনি জয়ী হবেন।

জাফর উল্যা টিটু জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থাশীল। তার আস্থা থাকায় তিনি টানা দুবার বিপুল ভোটের ব্যবধানে পৌর মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদ নির্বাচনেও নৌকার প্রার্থী হতে প্রস্তুত জাফর উল্যা টিটু।

আফতাব খান অমি বলেন, তাদের পরিবারের সঙ্গে সন্দ্বীপের মানুষের আত্মার সম্পর্ক। তার বাবা আকরাম খান দুলাল আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আস্থা রাখলে তিনি নির্বাচন করতে প্রস্তুত।

মিজানুর রহমান মিজান জানান, নতুন নেতৃত্বের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থা রয়েছে। অতীতে কোন নেতা ক্ষমতা পেয়ে কী ভূমিকা রেখেছেন, নেত্রী সব জানেন। এমন প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন।

তবে সন্দ্বীপের উন্নয়ন সম্পর্কে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রার্থীর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তারা বলছেন, উন্নয়নের নামে এখানে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে কোটি কোটি টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়েছে। তাই কোনো প্রকল্পের কাজই মানসম্মত হয়নি। কমিশন বাণিজ্যের কারণে নৌপথও নিরাপদ হয়নি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকার পরও নৌরুটে আসেনি নতুন জাহাজ। স্পিডবোট ও মালবাহী ট্রলারে যাতায়াত করতে যাত্রীদের বাধ্য করছেন জনপ্রতিনিধিরা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক। স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন। সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ রেষারেষিতে খুনোখুনিতে নিহত হয়েছে অন্তত এক ডজন মানুষ। সন্দ্বীপ মাদকের হাটে পরিণত হয়েছে।

মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, সন্দ্বীপ এখন এক ভীতিকর জনপদের নাম। গত নয় বছরে এখানে কোনো নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া হয়নি। আগামী নির্বাচনেও এমন পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা চলছে। তবে সন্দ্বীপের অর্ধেক ভোটারও ভোটকেন্দ্রে যেতে পারলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে ধানের শীষ। কারণ, সন্দ্বীপের মাটি বিএনপির ঘাঁটি। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আস্থা রাখলে ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আগামী নির্বাচনে আবারও বিজয়ী হবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তবে মোস্তফা কামাল পাশাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আটঘাট বেঁধে মাঠে আছেন দলেরই অপর মনোনয়নপ্রত্যাশী মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল। গত নির্বাচনগুলোতেও দলের মনোনয়নযুদ্ধে ছিলেন তিনি। বছরের বেশিরভাগ সময় আমেরিকা থাকলেও সন্দ্বীপে তার আলাদা ইমেজ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, আমেরিকাপ্রবাসী হলেও তার ধ্যান-জ্ঞানে আছে সন্দ্বীপ। এ জন্য স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ সন্দ্বীপের বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি সম্পৃক্ত রয়েছেন। দুঃসময়ে দলের অবহেলিত ও বঞ্চিত নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন।

নুরুল মোস্তফা খোকন বলেন, প্রবাসে থাকলেও সন্দ্বীপের সঙ্গে তিনি কখনই আত্মার সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। তিনি অবহেলিত এই জনপদের শতাধিক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার সংস্কার-পুনর্নির্মাণে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। মানুষের সুখে-দুঃখে একসঙ্গে থেকেছেন।

সন্দ্বীপে বিএনপি ঘরানার রাজনীতিতে দলের ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের আলাদা দুটি গ্রুপ রয়েছে। এর মধ্যে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হচ্ছেন সাবেক এমপি মোস্তফা কামাল পাশা। আর মোস্তফা কামাল পাশা বাবুল নেতা মানেন আসলাম চৌধুরীকে। আগামী নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে নেতাকর্মীরা মনে করছেন।

জাতীয় পার্টির এম এ সালাম বলেন, পার্টির মনোনয়ন পেলে তিনি আগামী নির্বাচনে লড়বেন। আর সন্দ্বীপের মানুষের সঙ্গে তার রয়েছে আত্মার সম্পর্ক।

এনপিপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী অধ্যক্ষ মোক্তাদের আজাদ খান বলেন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস লালন করায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ওপরেই মানুষ বিরক্ত। তারা বিকল্প শিক্ষিত নেতা খুঁজছে।