'আমি রোহিঙ্গা'

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সুমন মজুমদার

কানাডার টরেন্টোর একটি সিনেমা হল। বড় পর্দায় দেখা যাচ্ছে, নীল স্কার্ফ আর বোরকা পরিহিত এক রোহিঙ্গা কিশোরীর সামনে লাঠি ও অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে দুই রাখাইন তরুণ। তাদের চোখে ক্রূরতা এবং লালসা। কিশোরীটি কাঁদছে না; কিন্তু ভয়ে সে যেন ঠিক কথাও বলতে পারছে না। তবুও হাতজোড় করে কোনো মতে বলে- আমাকে মেরো না, আমাকে যেতে দাও, দয়া করে আমাকে কেউ বাঁচাও। কিন্তু অস্ত্র হাতে দুই তরুণ ওই কিশোরীর আর্তনাদ দেখে হাসে। এক পর্যায়ে তারা অস্ত্র উঁচিয়ে আঘাত করে কিশোরীকে এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর। এরপর কিশোরীর তীক্ষষ্ট চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার নেমে আসে পর্দায়।

অতঃপর ধীরে ধীরে পর্দায় ভেসে ওঠে রাসেল মোহাম্মদ নামে ১৫ বছর বয়সী আরেক রোহিঙ্গা কিশোরের মুখ। অপলক দৃষ্টিতে সে বলতে থাকে, 'আমি জানি একটু আগে শেষ হওয়া দৃশ্যটি দেখা আপনাদের জন্য কত কঠিন। আমিও এই দৃশ্যটি এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পরিনি। কারণ যে মানুষগুলো এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এটি তাদের জন্য শুভ হবে না। কিছু কিছু সময় চাইলেই সব কিছু এড়িয়ে যাওয়া যায় না।' সম্প্রতি কানাডায় নির্মিত 'আই এম রোহিঙ্গা :অ্যা জেনোসাইড ইন ফোর অ্যাক্টস' শিরোনামের ডকুমেন্টারিটিতে এভাবেই বর্ণনা করা হচ্ছিল মিয়ানমারের রাখাইনে এই সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো নির্যাতন গণত্যার। ডকুমেন্টারিটির বৈশিষ্ট্য হলো, এর ১৪ অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রত্যেকেই অভিবাসী রোহিঙ্গা। তাদের প্রত্যেকেরই জন্ম বাংলাদেশের কক্সবাজার অঞ্চলের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে। তাদের বাবা-মা, ভাইবোন বা স্বজনের কেউ না কেউ রাখাইনে নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। ভাগ্যচক্রে তাদের কেউ কেউ নানা উপায়ে পাড়ি জমিয়েছেন কানাডায়। তাই গত ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে নতুন করে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা গণহত্যা দেখে তারা চুপ থাকতে পারেনি। নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তারা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বানিয়েছেন এই ডকুমেন্টারিটি।

ডুকমেন্টারিটি পরিচালনাও করেছেন তরুণ চলচ্চিত্রকার ইউসুফ জাইন। সম্প্রতি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কানাডা সরকারের নানা পরিকল্পনার মধ্যে তার বানানো ডকুমেন্টারিটি তুমুল আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে। গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমার-সংক্রান্ত কানাডার বিশেষ দূত বব রে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দিয়েছেন।

ইউসুফ বলেন, এই ডকুমেন্টারিতে যারা অভিনয় করেছেন, তাদের প্রত্যেকেরই বয়স ৮ থেকে ২২ বছর। তারা প্রত্যেকেই রোহিঙ্গা। ডকুমেন্টারির চরিত্রগুলো ফুটিয়ে তুলতে তাদের বাবা-মা এবং স্বজনরা খুব সাহায্য করেছেন। ডকুমেন্টারিটির নামে আমাদের একটি ওয়েবসাইটও করা হয়েছে। কেউ চাইলে সেখান থেকে এর সম্পর্কে তথ্য নিতে পারেন। আগামী ১১ ও ১২ মে টরেন্টোতে আবারও ডকুমেন্টারিটি প্রদর্শিত হবে। খবর কানাডা নিউজ হান্ট ও দ্য স্টারের।