চিকিৎসার ৬৭ শতাংশ ব্যয় যায় ব্যক্তির পকেট থেকে

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস আজ

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সমকাল প্রতিবেদক

স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে। অপরদিকে সরকারের ব্যয় প্রতিবছর কমছে। স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে ৬৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে। আর সরকার বহন করে মাত্র ২৩ শতাংশ। এ খাতে মাথাপিছু সরকারি ব্যয় কমানোর কারণে দরিদ্র মানুষ বেশি সমস্যায় রয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় পাঁচ শতাংশ পরিবার প্রতিবছর দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে।

এ অবস্থায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য 'সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা :সবার জন্য সর্বত্র'। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এ খাতে সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে। ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে ব্যয় কমানোর ওপর জোর দিতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার পরিধি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানকার মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৩ শতাংশ ব্যক্তি পকেট থেকে বহন করত। বিগত পাঁচ বছরে তা ৪ শতাংশ বেড়েছে। এনজিও এবং দাতা সংস্থাগুলো ব্যয়ের ১০ শতাংশ বহন করে। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষই স্বাস্থ্যসেবা পেতে নিজের পকেট থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে।

ওই গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবা নিতে চলে যায়। এরপর পর্যায়ক্রমে হাসপাতালে ৩০ শতাংশ, হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা সেবায় ১৫ শতাংশ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ৬ শতাংশ, প্রশাসনিক খাতে ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ২ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়। জনস্বাস্থ্য কর্মকাণ্ডে ব্যয় হয় মাত্র ২ শতাংশ।

এ বিষয়ে চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, একদিকে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে; অপরদিকে স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যক্তির ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্ররা সরকারের ওপর আস্থা রাখে। তাই সরকারের স্বাস্থ্য খাতে অর্থ কমে যাওয়ার মানে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হবে। ব্যক্তির ব্যয় না কমলে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা শুধু স্লোগান হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকারি হাসপাতালে নামমাত্র মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা

নিশ্চিত করা হচ্ছে। হাসপাতালের মোট শয্যাসংখ্যার প্রায় অর্ধেক বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া রোগীকে ওষুধ, পথ্য থেকে বিভিন্ন সুবিধা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি কোনো হাসপাতালে কিংবা বিদেশে গিয়ে কোনো ব্যক্তি যখন চিকিৎসা নিয়ে থাকেন, তখন ব্যয় বাড়ে। ব্যক্তির ওই বর্ধিত ব্যয়ই সব মানুষের ব্যয়ের সঙ্গে আনুপাতিক হিসাবে চলে যায়। এতে ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে ব্যয় বেড়ে যায়। তবে জাতিসংঘ ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ব্যক্তির ব্যয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সরকার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। জনগণ এর সুফল পাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। বিশ্বের ৮০ কোটি মানুষ তাদের পরিবারের মোট ব্যয়ের অন্তত ১০ শতাংশ চিকিৎসাসেবায় নিজেদের পকেট থেকে বহন করে।

জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে আরও একশ' কোটি মানুষকে অতি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসাসেবার ব্যয় বহন করতে বছরে যে প্রায় ১০ কোটি মানুষ অতি দরিদ্র হয়ে পড়ছে, তাদের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি বছর মাথাপিছু স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় ৪০ মার্কিন ডলার হওয়া প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ২৭ মার্কিন ডলার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ সমকালকে বলেন, রোগীদের অর্থের একটি বড় অংশ চলে যায় ওষুধ কিনতে। ওই ওষুধের দাম যেমন মাত্রাতিরিক্ত আবার প্রয়োজনের বাইরেও অনেক সময় চিকিৎসক ওষুধ দিতে থাকেন। এতে দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়ে। এ ব্যয় মেটাতে গিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ আরও দরিদ্র হচ্ছে। তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে সারাদেশে কাজ করেন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও প্রতিষ্ঠানের ইপিমেডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার। তিনি সমকালকে বলেন, জনস্বাস্থ্য খাতের মূল বিষয় রোগ প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া। কিন্তু বাংলাদেশে তা অত্যন্ত দুর্বল। ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক ব্যাধি দিন দিন বাড়ছে। এসব ব্যাধির চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি। তাই এসব রোগের প্রকোপ কমাতে জনসাধারণকে সচেতন করে তোলা জরুরি। তাই জনস্বাস্থ্য কর্মকাণ্ডে ব্যয় ও বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সিরাজুল হক খান বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার ইতিমধ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। ব্যক্তির পকেট থেকে কীভাবে ব্যয় কমানো যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

কর্মসূচি :আজ সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আয়োজিত দিবসের মূল অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। এ ছাড়া সারাদেশে এ উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা ও সচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে।