সীমান্তে সরেজমিন

বদলে গেছে পরিস্থিতি

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

রাজবংশী রায়, পশ্চিমবঙ্গের টাকী থেকে ফিরে

বদলে গেছে পরিস্থিতি

সীমান্তঘেঁষা গ্রামে আকরাম আলী গাজীর থাকার ঘর ভারতে (বাঁয়ে) আর রান্নাঘর বাংলাদেশে (ডানে) - সমকাল

ঘর-গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত মঞ্জুরা বেগম। তার পাশেই একদল শিশুর জটলা। প্রত্যেকের বয়স ৬ থেকে ৮ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে দুই শিশু সোহেল ও আমিনুর। মঞ্জুরা বেগমের যে ঘরটিতে শিশুরা খেলছে তার পাশের ঘরটি সোহেলদের। দূরত্ব সর্বোচ্চ দুই ফুট। ছোট্ট এই দূরত্ব সোহেলকে বাংলাদেশি এবং আমিনুরকে ভারতীয় নাগরিকের মর্যাদা দিয়েছে। ইছামতি নদীর তীরবর্তী একটি সীমানা পিলার তাদের দুটি পৃথক দেশের বাসিন্দায় পরিণত করেছে। সীমানা পিলারটি বাংলাদেশ ও ভারত সীমান্তের 'জিরো পয়েন্ট' হিসেবে বিবেচিত হয়। এ দুই শিশুর মতোই বাংলাদেশের সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার হাড়দ্দা এবং পশ্চিমবঙ্গের টাকী পৌরসভার পানিতর গ্রামের আরও শতাধিক পরিবারের জীবন-জীবিকা পিলারের বেড়াজালে বন্দি। তবে গত কয়েক বছরে বিজিবি ও বিএসএফ জওয়ানদের আচরণে সীমান্তবর্তী মানুষ আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশি কয়েকজন নাগরিক জানান, আগে বিএসএফ দেখলেই তারা আতঙ্কিত হতেন। কিন্তু পাঁচ-ছয় বছর ধরে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। সংঘাতের পরিবর্তে সীমান্তে গড়ে উঠেছে বন্ধুত্বের বন্ধন।

ভারতীয় হাইকমিশনের আমন্ত্রণে এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শন করে। সাংবাদিক প্রতিনিধি দলে এ প্রতিবেদকও ছিলেন। সরেজমিন সাতক্ষীরার ইছামতি নদীর জিরো পয়েন্ট পরিদর্শন করে যেসব বিষয় নজরে এসেছে, তা বিচিত্রই বলা যায়। ভূমিরেখা দুই দেশকে এমনভাবে বিভক্ত করেছে যে, একজনের ঘর ভারতে এবং রান্নাঘর বাংলাদেশে। আবার কারও ঘর বাংলাদেশে, গোয়ালঘর ভারতে। আবার কারও ঘর ভারতে এবং পুকুর বাংলাদেশের সীমান্তে পড়েছে। ভারতের নাগরিকদের পানির জন্য বাংলাদেশে আসতে হয়। আবার চিকিৎসার জন্য সীমান্তের বাংলাদেশি নাগরিকদের যেতে হয় ভারতে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন অনুযায়ী, এক দেশের নাগরিক ভিসা ছাড়া আরেক দেশে প্রবেশ করতে পারেন না। তবে সীমন্তবর্তী মানুষের ক্ষেত্রে তা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। স্বজনের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎ, চিকিৎসা সুবিধাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ

প্রয়োজনে তারা দু'দেশে যাতায়াত করতে পারেন। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ সীমান্ত এলাকার মানুষকে নির্বিঘ্ন জীবনযাত্রায় সহায়তা করে চলেছে। অনুমতি সাপেক্ষে তারা প্রয়োজনে দুই দেশের নাগরিকদের যাতায়াতের সুযোগ করে দিচ্ছে। দু'দেশের জনপ্রতিনিধিরাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পানিতর গ্রাম পঞ্চায়েত হাজি রজব আলী মোল্লা তাদের একজন। রজব আলী মোল্লা জানান, গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে একদিন রাতে সাতক্ষীরার হাড়দ্দা গ্রাম থেকে এক ব্যক্তি ফোন করে তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর অসুস্থতার কথা তাকে জানান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিষয়টি বিএসএফ সদস্যদের অবহিত করেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে বিএসএফ এবং বিজিবির সদস্যদের সহায়তায় ওই নারীকে ভারতের টাকী পৌরসভার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই নারী সেখানেই পুত্র সন্তানের জন্ম দেন।

পানিতর বিএসএফের ১৬০ নম্বর ব্যাটালিয়নের প্রধান কেএস স্লাথিয়ার কথায়ও উচ্চারিত হলো বন্ধুত্বের বার্তা। তিনি বলেন, হাড়দ্দা ও পানিতরের সীমান্ত রেখা আঁকাবাঁকা। কোনো কোনো অংশে দুই দেশের দূরত্ব মাত্র দুই ফুট। তাই বিএসএফ ও বিজিবি এখানে মানবিকতাকেই প্রাধান্য দেয়।

স্লাথিয়া আরও জানান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তাদের কাছে এক নয়। বাংলাদেশ ভারতের বন্ধুরাষ্ট্র। বাংলাদেশ সীমান্তে যাতে গুলি করা না হয় সে জন্য বিএসএফ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে অপরাধীরা গুলি করতে বাধ্য করে। এত কাছ থেকে অপরাধীরা আক্রমণ করে যে, আত্মরক্ষার্থে তখন বাধ্য হয়েই গুলি করতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতেও গুলি না করে বিকল্প উপায়ে ঘটনা মোকাবেলার জন্য বিএসএফ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে বিএসএফ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে স্বল্পকালীন ভিসা ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা মনে করেন, বর্তমানে দুই দেশে যাতায়াত করতে হলে বিএসএফ ও বিজিবির সহায়তার প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্বল্পকালীন ভিসা চালু করলে তারা চিকিৎসা সুবিধা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেতেন।

ভারতের বাসিন্দা দাউদ আলী গাজীর বসতঘর ভারতে এবং গোয়ালঘর বাংলাদেশে পড়েছে। তিনি বলেন, আমরা ভারতের নাগরিক। ওপারে আত্মীয়রা আছেন। তাই চাইলেই দেখা করতে যেতে পারি না। বিএসএফ ও বিজিবির অনুমতি নিয়ে জরুরি প্রয়োজনে তারা স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

শফিকুল ইসলামের ঘর বাংলাদেশে এবং রান্নাঘর ভারতে পড়ছে। তিনি বাংলাদেশি নাগরিক। তার বোন সখিনা ভারতীয় নাগরিক। শফিকুল ইসলাম জানান, ভারতে তার অনেক বন্ধু আছে। মাঠে একসঙ্গে কাজ করি। আড্ডা দিই। তবে সীমান্তরেখা দেখে মনে হয় দুটি আলাদা দেশ। একই কথা বললেন আক্রাম আলী গাজী। তিনি বলেন, একসময় দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিয়ে হতো। কিন্তু এখন আর হয় না। দুই দেশের সরকার মিলে পারমিট ব্যবস্থা চালু করলে আমরা উপকৃত হতাম।

গত ২৮ মার্চ কলকাতার লর্ড সিনহা রোডে বিএসএফ সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানের ডিআইজি শিরি আজমল সিং বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারে বিএসএফের কাজের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চোরাচালান ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার 'ক্রাইম ফ্রি জোন' বা 'অপরাধমুক্ত এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে নন লিথাল অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ভারতীয় হাইকমিশনের আমন্ত্রণে এবং বিএসএফের ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধি দলটি গত ২৮ মার্চ দুপুরে কলকাতা পৌঁছায়। বিএসএফের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলকে সুন্দরবন এলাকা এবং উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিতর এলাকায় সীমান্ত রক্ষা কার্যক্রম ঘুরিয়ে দেখানো হয়।