সীমান্তে সরেজমিন

'বন্ধুত্বের সাঁকো'

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

সাহাদাত হোসেন পরশ, উত্তর চব্বিশ পরগনার বনগাঁও থেকে

'বন্ধুত্বের সাঁকো'

যশোরের শার্শা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁওয়ে অপরাধমুক্ত এলাকা- সমকাল

মাঠজুড়ে সবুজ ধানক্ষেত। মাথায় গামছা বেঁধে, হাতে কাঁচি নিয়ে চৈত্রের তপ্ত দুপুরে ধানের পরিচর্যা করছিলেন কৃষক জিয়াউর রহমান। তার ক্ষেতের পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে 'লাউভাঙা' নামে ছোট্ট একটি নদী; যা ইছামতির সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। লাউভাঙা নদীর প্রশস্ততা এতটাই ছোট হয়ে এসেছে যে, এক পাশ থেকে কেউ হাঁকডাক দিলে অন্য পাশ থেকে স্পষ্ট শোনা যায়। নদীটি ওই এলাকায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত আলাদা করেছে। নদীর এক পাশে যশোরের শার্শার দৌলতপুর ও অন্য পাশে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁও। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের একটি প্রতিনিধি দলকে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সাউথ বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারের পক্ষ থেকে বনগাঁও সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে নেওয়া হয়। সেখানে গেলেই লাউভাঙা নদীটি চোখে পড়ে। নদীর ওপর তৈরি করা হয়েছে বাঁশের বড় সাঁকো। সাঁকোর এক পাশে বাংলাদেশ ও অন্য পাশে ভারত। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কাছে এরই মধ্যে সাঁকোটি পরিচিতি পেয়েছে 'বন্ধুত্বের সাঁকো' নামে। সাঁকো পেরিয়ে যখন কৃষক জিয়াউরের কাছে গিয়ে বাংলাদেশি সাংবাদিক পরিচয় দিলাম, তখন নিজ থেকেই অনর্গল সীমান্ত এলাকার নানা বিষয়ে কথা বলা শুরু করলেন তিনি। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা হিসেবে এপার বাংলা আর ওপার বাংলার অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে ভালো ধারণা রয়েছে বাংলাদেশি নাগরিক জিয়াউরের।

তিনি বললেন, সীমান্ত দুই দেশ আলাদা করেছে বটে, তবে দুই বাংলার মানুষের ভাষা, খাবারের অভ্যাস, জমিজমা, কাজকর্মের ধরন ও চেহারা প্রায় একই ধরনের। হাত উঁচিয়ে নদীর ওপারে দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত দেখিয়ে জিয়াউর বললেন, ওটা ভারত। ওখানকার ধানক্ষেতে এখন যেসব কৃষককে কাজ করতে দেখছেন, সেও আমার মতো। কাজ করতে করতে যখন ক্লান্তি আসে, কখনও কখনও নদীর এপাশ থেকে হাঁকডাক দিয়ে ভারতের কৃষকের সঙ্গে দু-চারটা কথাও বলি। কথা বলাটা তো অন্যায় নয়। সীমান্তরেখা তো এটা আটকাতে পারে না। পাখি, বাতাস ও নদীর স্রোতের মতো দুঃখ-সুখের আলাপ চলতে থাকে। দুই দেশের ধানের দরদাম নিয়ে কথা হয়- আরও কত কিছু!

সাঁকো পেরিয়ে আবার যখন বনগাঁও সীমান্ত এলাকায় প্রবেশ করলাম, তখন সেখানে দিলীপ হালদার ও রৈতন মণ্ডলসহ কয়েকজন ভারতীয় কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। একই সঙ্গে বিএসএফের এত সদস্য আর হাতে বুমসহ সংবাদকর্মীদের দেখে তারা কাজ বন্ধ রেখে এগিয়ে এলেন। দিলীপ হালদার জানালেন, আগে সীমান্তের ওই এলাকা দিয়ে

গরুসহ অনেক কিছু পাচার হতো। এখন তা নেই। দিলীপসহ অন্য কৃষকরা চান না পাচারের মতো বেআইনি কাজে জড়িয়ে গ্রামের লোকজনের ভাবমূর্তি কেউ নষ্ট করুক। জিয়াউরের মতো দিলীপ এও বললেন- লাউভাঙা নদী তাদের এলাকায় সীমান্ত আলাদা করলেও মাঝে মধ্যে এপার-ওপারের কৃষদের মধ্যে হাঁকডাক দিয়েই কথা হয়।

৯ মার্চ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রথমবারের মতো ৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার এলাকা 'ক্রাইম ফ্রি জোন' বা 'অপরাধমুক্ত এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করেছিল দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি ও বিএসএফ। যশোরের শার্শা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁও সীমান্তে ৬৪ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের কালিয়ানি বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকা 'ক্রাইম ফ্রি জোন' ঘোষণা করা হয়। ক্রাইম ফ্রি জোন ঘোষণার পর গত এক মাসে সীমান্তের ওই এলাকার কী ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে- তা সরেজমিন পরিদর্শনের জন্য সংবাদকর্মীদের সেখানে নেওয়া হয়। বিএসএফের কমান্ড্যান্ট মনোজ কে বাড়ওয়াল জানান, ক্রাইম ফ্রি জোন ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত সীমান্তের ওই এলাকায় ছোট-বড় কোনো ধরনের একটিও বেআইনি কাজ সংঘটিত হয়নি। স্থানীয় সাধারণ মানুষকেও ক্রাইম ফ্রি জোন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। পাইলট প্রজেক্টের আওতায় এটা করা হয়েছে।

পরে যোগাযোগ করা হলে বিজিবির ২১ ব্যাটলিয়নের অধিনায়ক তারিকুল হাকিম জানান, ক্রাইম জোন ঘোষণার পর তার এলাকায়ও গত এক মাসে কোনো ধরনের অপরাধ হয়নি।

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বেনাপোল পৌঁছালে প্রথমে বিজিবির পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরপর পেট্রাপোলে পৌঁছালে বিএসএফের সাউথ ফ্রন্টিয়ারের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করা হয়। সেখানে বিএসএফের ৬৪ ব্যাটালিয়নের সেকেন্ড ইন কমান্ড বাঘাবিন্ডার সিং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নানা চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত দুই বছর বিএসএফের ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধীনস্থ সীমান্ত এলাকায় কোনো বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়নি। প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহারের নীতি তারা গ্রহণ করেছেন। এটা বাস্তবায়ন করছেন। সীমান্তে যে কোনো ধরনের অপরাধ শূন্যের কোঠায় আনাই তাদের মূল লক্ষ্য।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ক্রাইম ফ্রি জোন ঘোষণা উপলক্ষে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন, বিএসএফ মহাপরিচালক কে কে শর্মা ভারতের বনগাঁও আর বাংলাদেশের শার্শার থানা এলাকার সীমান্তে লাউভাঙা নদীর ওপর সাঁকো তৈরি করা হয়। ৯ মার্চ ক্রাইম ফ্রি জোন ঘোষণার দিন ওই সাঁকোর মাঝখানেই দাঁড়িয়ে বিজিবি ও বিএসএফ প্রধান শান্তির পতাকা ওড়ান। সেই থেকে ওই সাঁকোটি বন্ধুত্ব আর শান্তির সাঁকো হিসেবে পরিচিত। নদীতে আছে প্যাট্রল বোটও। অনেক সময় ওই বোট ব্যবহার করে দুই দেশ সীমান্তে সমন্বিত টহলও দিয়ে থাকে।

২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে 'ক্রাইম ফ্রি জোন' ঘোষণার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিএসএফ মহাপরিচালক কে কে শর্মা ওই প্রস্তাবের প্রশংসা করেন। 'ক্রাইম ফ্রি জোন' বাস্তবায়নের বিষয়টি ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় উভয় দেশের সম্মতিতে বাংলাদেশের যশোর শার্শা সীমান্তের পুটখালী ও দৌলতপুর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এবং বিপরীত দিকে ভারতের কালিয়ানি ও গুনারমঠ বিওপির দায়িত্বপূর্ণ ৮ দশমিক ৩ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা পরীক্ষামূলকভাবে 'ক্রাইম ফ্রি জোন' ঘোষণা করা হয়।

'ক্রাইম ফ্রি জোন' ঘোষিত সীমান্তে বাংলাদেশ অংশে কার্যকরভাবে অপরাধ প্রতিরোধের লক্ষ্যে বিজিবির উদ্যোগে এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বর্ডার সার্ভেইল্যান্স সরঞ্জাম যেমন- ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা, সার্চলাইট, থার্মাল ইমেজার ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিজিবির উদ্যোগে সীমান্তে অপরাধ প্র্রতিরোধে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত অপরাধ যেমন- চোরাচালান, নারী ও শিশু পাচার, মানব পাচার, মাদক, অস্ত্র ও বিস্ম্ফোরক পাচার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড যাতে সংঘটিত না হয়, সে লক্ষ্যে বিজিবি ও বিএসএফ পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি করবে। বাংলাদেশের কৃষক জিয়াউর ও আর ভারতের কৃষক রৈতন মণ্ডলের মতো সবার চাওয়া- সীমান্ত হয়ে উঠুক সম্পূর্ণ অপরাধমুক্ত। সেখানে প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হবে বন্ধুত্ব ও সুন্দর প্রতিবেশীর সব নিদর্শন। যার যাত্রা এরই মধ্যে শুরু হয়ে অনেক দূর এগিয়েছে বলেও মনে করেন দুই দেশের সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ।