কমনওয়েলথ গেমস ডায়েরি

কত অজানারে...

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০১৮      

গোল্ড কোস্ট থেকে, মশিউর রহমান টিপু

কত অজানারে...

গোল্ড কোস্টের রাস্তায় প্রতীকী টিকিট হাতে এবারের কমনওয়েলথ গেমসের মাসকট সংগৃহীত

জীবনে কত না চড়াই-উতরাই পার হতে হয়! সিটি অব গোল্ড কোস্টে এসে আক্ষরিক অর্থেই সেই চড়াই-উতরাই পার হচ্ছি প্রতিদিন। এখানকার জনপদ অসাধারণ শান্ত ও সিগ্ধ। বেশিরভাগ নাগরিকের বসবাস ২০-২৫ কিলোমিটার দূরের শহরতলিগুলোতে। কিছুটা পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সেই শহরতলিতে যাতায়াতের পথে একবার খাড়া উঁচুতে উঠে যেতে হয়, আবার সরসর করে নেমে যেতে হয় ঢাল বেয়ে। এই পথে গাড়িতে বসেই যেন অ্যামিউজমেন্ট পার্কের রোলার কোস্টারে চড়ার উত্তেজনা মিলে যায় বিনা পয়সায়। পয়সা মানে কয়েন এখানে এখনও দাপটের সঙ্গেই সচল। একদিনের খুচরোতেই ভারী হয়ে যায় পকেট।

প্রশান্ত মহাসাগরের কোলে গড়ে ওঠা গোল্ড কোস্ট খুবই শান্ত, স্নিগ্ধ ও প্রাণবন্ত এক জনপদ। মূল শহরজুড়ে এত এত উঁচু দালানকোঠা যে এটাকে বিশ্বের অন্যতম স্কাই স্ট্ক্র্যাপার সিটি বলা যেতেই পারে। এখানে সাজানো রয়েছে জীবনের সব আয়োজন।

অদূরবর্তী শহরতলিগুলো কিন্তু চেহারায় একেবারে অন্য রকম। আরও বেশি ছিমছাম, পরিপাটি। ব্রিটিশ ঐতিহ্যের ধারক অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরের মতো গোল্ড কোস্টেও আবাসিক এলাকাগুলোতে হাইরাইজ নেই। দোতলা বাড়িও সহজে চোখে পড়ে না। বেশিরভাগই একতলা বাড়ি, যার চারপাশে বেশ খানিকটা জায়গা ফাঁকা রেখে দেওয়া। সেখানে যে যার পছন্দমতো বাগান করছে। প্রতিটি বাড়ির সামনে একটা-দুটো তো গাছ থাকবেই। বাড়িগুলো দেখতেও প্রায় একই রকম।

গোল্ড কোস্ট এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ। মাত্র দুই-তিন দিনের দেখা ও শোনার ওপর ভরসা করে এ রকম একটা শহর নিয়ে বেশি লেখাটা 'নিরাপদ' মনে হয় না। তাতে তথ্যের গোলমাল থেকে যেতে পারে। জানার কি কোনো শেষ আছে; বরং অজানা বিষয়ের পাল্লাই। আজকাল তো একটা বাচ্চাও ঘরে বসে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যে কোনো জায়গার অলিগলির খবর জেনে নিতে পারে অনায়াসে। কীভাবে? আরে, গুগল 'মামা' আছে না!

জানার যেহেতু কোনো শেষ নেই, তাই যতটুকু জানা গেল সেটুকুই আপাতত শেয়ার করি পাঠকের সঙ্গে। একুশতম কমনওয়েলথ গেমসের মূল মেসেজ হচ্ছে, শেয়ার দ্য ড্রিম। সেই ভরসাতেই এই শেয়ার করতে চাওয়া। গত ৩ এপ্রিল বিকেলে গোল্ড কোস্টে পা রাখার পর থেকেই যে জিনিসটা সব সময় চোখে পড়ছে তা হলো কমনওয়েলথ গেমস ঘিরে এখানকার অধিবাসীদের অপরিসীম আন্তরিকতা। শহরে একটা ক্রীড়াযজ্ঞ চলছে আর তাতে যোগ দিতে আসা মানুষজনের যাতে কোথাও কোনোরকম অসুবিধা না হয়, তার জন্য নিজেদের ছোটখাটো অসুবিধাগুলো হাসিমুখেই মেনে নিচ্ছেন তারা। তার একটি হলো, রাস্তায় কিছুটা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা, যা এখানকার নাগরিকদের জীবনে অকল্পনীয়। বেশিরভাগ রাস্তারই একটি লেন নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে 'গেমস লেন' হিসেবে। ওই লেনে অন্য কোনো গাড়ি চলাচল করতে গেলেই জরিমানা। তবে সেই চেষ্টা কেউ করেছেন বলে এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। যেসব ভেন্যুতে খেলা থাকে, তার চারপাশের রাস্তা আবার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় একটা লম্বা সময়ের জন্য। তাতে এ রাস্তা, সে রাস্তা দিয়ে ২০ কিলোমিটারের গন্তব্যে যেতে হয়তো বাড়তি আরও পাঁচ-ছয় কিলোমিটার ঘুরতে হচ্ছে। প্রতিদিন এভাবে ঘুরতে ঘুরতে প্রায়ই পুরান ঢাকার বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির উদাহরণটা মাথায় আসে। টুং টাং ঘণ্টা বাজিয়ে চলা কয়েকটা রিকশা নামিয়ে দেওয়া যেতে পারলে মন্দ হতো না।