বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস আজ

স্বাস্থ্য অধিকারে ধারণা নেই ১২ ভাগ নারীর

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০১৮      

নাহিদ তন্ময়

গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসব ও পরবর্তী সেবা পাওয়া নারীর মৌলিক অধিকারের অংশ। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক নারী নিজে ও তার পরিবারে এখনও স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। দেশের ১২ ভাগ নারী-কিশোরী তাদের স্বাস্থ্য অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা নানা কর্মসূচি গ্রহণ করলেও যাতায়াতসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতা পার হয়ে এসব নারী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার জনবল সংকটও সেবা নিশ্চিত হওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে।

সমাজে নারীর অনগ্রসর অবস্থান, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক কুসংস্কারসহ নানা কারণে এখনও বছরে ৭-৮ হাজার নারী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারান। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর বলছে, ৬২ ভাগ নারী এখনও বাসায় ঝুঁকিপূর্ণ সন্তান প্রসব করেন। বাংলাদেশে প্রসূতি মৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে এলেও অসচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত সেবার অভাবে অনেক নারী প্রসবজনিত জটিলতায় বিভিন্ন রোগে ভুগছেন, যা তার পরবর্তী জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। দেশে ৫৯ ভাগ কিশোরীর ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। আবার তাদের মধ্যে ৩১ ভাগই গর্ভধারণ করে। আর বিবাহিত কিশোরীদের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার মাত্র ৪৭ ভাগ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত পরিবার মানবাধিকারের অংশ। পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি আরও সফলভাবে কার্যকর করতে হলে সেবাগ্রহীতাদের মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দম্পতিদের কাছে মানসম্পন্ন সেবা সহজলভ্য করে তুলতে হবে। সেবার ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন।

এ পরিস্থিতিতে আজ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য 'পরিকল্পিত পরিবার, সুরক্ষিত মানবাধিকার'। দিবসটি যথাযথভাবে পালন করতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভাসহ জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তারা বলেন, সুস্থ-সবল জাতি গড়ে তুলতে পরিকল্পিত পরিবার গঠনে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, গণমাধ্যম, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আরও সক্রিয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।

অভিযোগ রয়েছে, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মীই বয়োজ্যেষ্ঠ। তাদের দ্বারা স্বাভাবিকভাবেই আশানুরূপ সেবা পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রেই তারা যাতায়াতসহ ছোটখাটো প্রতিবন্ধকতা পার হয়েও জনগণের কাছে যেতে পারেন না। বর্তমান সময়ের এই চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই সবার আগে দক্ষ জনবল নিশ্চিত করতে হবে। আগের মাঠকর্মী দিয়ে ২০১৮ সালের মাঠের চাহিদা পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে জানান সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক কাজী মোস্তফা সারোয়ার সমকালকে বলেন, পরিকল্পিত পরিবার বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। জন্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশ কিছুটা পিছিয়ে আছে। দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুতে কোনো সংকট নেই। মাঠে জনবলের সংকট দূর করতে অন্তত আট হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনও এ কর্মসূচি সম্পর্কে সচেতন নয়। সারাদেশে মোট প্রজনন হার যেখানে দুই দশমিক তিনজন, সেখানে চট্টগ্রামে দুই দশমিক পাঁচজন এবং সিলেটে দুই দশমিক নয়জন। তবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে রংপুর ও খুলনা বিভাগে সফলতা এসেছে। এই দুই বিভাগেই মোট প্রজনন হার এক দশমিক নয়জন করে। প্রতি ১০০ দম্পতির মধ্যে রংপুরে ৭০ এবং খুলনায় ৬৭ জন দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির আওতায় রয়েছেন। তবে এখনও যথাক্রমে সাত ও নয় শতাংশ দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বাইরে রয়েছেন। এ ছাড়া মোট প্রজনন হার রাজশাহীতে দুই দশমিক একজন, বরিশালে দুই দশমিক দু'জন এবং ঢাকায় দুই দশমিক তিনজন। রাজশাহীতে ৬৯ ভাগ, বরিশাল এবং ঢাকায় ৬৩ ভাগ দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নেন। সারাদেশে এখনও ৩৭ ভাগের বেশি দম্পতি পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার করছেন না।

পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্য কার্যক্রমে সাফল্য অর্জনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর। এসবের মধ্যে বাল্যবিয়ে হ্রাস, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার বাড়ানো, ড্রপ আউটের হার হ্রাস, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাকর্মীর মাধ্যমে প্রসবের হার বৃদ্ধি, সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য হ্রাস, দুর্গম এলাকায় যথাযথভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়া অন্যতম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ২০০৪ সাল পর্যন্ত পরিবার পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য সফলতা ছিল। এরপর পুরো বিষয়টা একটা জায়গায় এসে থেমে গেছে। বর্তমান সময়ে যেসব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে, তা মোকাবেলা করতে কর্মকৌশল পরিবর্তন করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা, চেতনা, রুচিবোধের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। তাই কর্মসূচিও ঢেলে সাজাতে হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পপুলেশন কমিউনিকেশন কর্মকর্তা খন্দকার মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের জনসংখ্যার ২৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী। দেশের কিশোরী মায়েদের সংখ্যা যেমন কমানো দরকার, পাশাপাশি তাদের জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।