নির্বাচনের আগে সুদহার কমছে না সঞ্চয়পত্রের

পর্যালোচনায় কমিটি গঠন

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০১৮

সমকাল প্রতিবেদক

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশ ও ব্যাংকগুলোর দাবির পরেও সরকার সাধারণ সঞ্চয়কারীদের স্বার্থে এখনই সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমাচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হবে না। তবে নির্বাচনের পরে সঞ্চয়পত্রের পুরো ব্যবস্থারই খোলনলচে পাল্টে ফেলা হবে। এজন্য অর্থ বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই মাসের মধ্যে কমিটি গবেষণা করে সঞ্চয়পত্রের সুদহার, ধরন, বিনিয়োগ সীমা, লেনদেন ব্যবস্থাসহ নানা বিষয়ে সুপারিশ দেবে। নতুন সরকার ওই সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সঞ্চয়পত্র নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভা শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সিএজি

মুসলিম চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়া, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শামসুন্নাহার বেগম উপস্থিত ছিলেন।

বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী ব্যাংকগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহারও কমিয়ে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। ১ জুলাই থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকরের ঘোষণা দেয় ব্যাংকগুলো। কিন্তু অনেক ব্যাংকই তা করেনি। এজন্য গত ২ আগস্ট সরকারি বেসরকারি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে বৈঠকে বসেন অর্থমন্ত্রী। ওই বৈঠকে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, যেসব ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারেনি, ৯ আগস্ট থেকে তারাও কমিয়ে আনবে। তবে আমানত সরবরাহ ঠিক রাখতে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর দাবি জানানো হয়। বৈঠকে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়, সঞ্চয়পত্রে সুদহার না কমিয়ে ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানতে ঘোষিত নতুন সুদহার কার্যকর করা কঠিন। সে সময় অর্থমন্ত্রী জানান ৮ আগস্ট সঞ্চয়পত্রের সুদহার পর্যালোচনায় সংশ্নিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করা হবে। অর্থমন্ত্রী ঘোষিত সময়ের একদিন আগেই সেই বৈঠক করলেন।

অনেকদিন ধরেই সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর কথা শোনা যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেয়নি। গত ২ আগস্ট বলা হয়, সঞ্চয়পত্র নিয়ে ৮ আগস্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর থেকেই সঞ্চয়পত্রের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সকল অফিস ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সঞ্চয়পত্র কেনার হিড়িক পড়ে। কয়েকদিন ধরে সকাল থেকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। গতকালও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। কোনো কোনো ডাকঘরে গিয়ে অনেকেই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেননি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। জানা গেছে, বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা, যা বাজারে যে অর্থ সরবরাহ রয়েছে তার ২২ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ সঞ্চয়পত্রের অর্ধেকই গত দুই বছরে বিক্রি হয়েছে।

বৈঠকের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, কিছুদিন আগে ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ঠিক করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সঞ্চয়পত্রের সুদহার পর্যালোচনা করা হলো। কারণ সঞ্চয়পত্রের সুদহার ব্যাংকের আমানতের সুদহারে প্রভাব ফেলে। কিন্তু সঞ্চয়পত্র নিয়ে সরকারের একটা নীতি আছে। তাহলো সঞ্চয়পত্রকে সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। যে কারণে হঠাৎ করেই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারের সুদহারের চেয়ে খুব বেশি রাখা যাবে না। এক থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত বেশি রাখা যেতে পারে। বর্তমানে এরচেয়ে বেশি রয়েছে। এটা কোনোভাবেই বাজার সুদহার থেকে ব্যাপক পার্থক্য হতে পারে না।

মন্ত্রী বলেন, 'নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদহারে কোনো পরিবর্তন করা হচ্ছে না। এখন কিছু কাজ করে রাখা হচ্ছে, পরের সরকার তা বাস্তবায়ন করবে। তার মতে, আওয়ামী লীগই আবার সরকারে আসবে। কারণ আওয়ামী লীগ গত ১০ বছর ধরে দেশের উন্নয়নে অনেক কাজ করেছে। জনগণের উন্নয়ন হয়েছে। ফলে জনগণ আওয়ামী লীগকেই চাইবে। আর যদি বিরোধী কোনো দল আসে তাদের জন্য অনেক উপকার হবে, কারণ আমরা কাজ এগিয়ে রাখছি।'

মুহিত বলেন, উচ্চ পর্যায়ের এই কমিটি গবেষণা করে বর্তমানে অর্থনীতিতে সঞ্চয়পত্রের প্রভাব কী তা দেখবে। পাশাপাশি বর্তমানে যত ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে, সব থাকা দরকার কি-না, কোন ধরনের সঞ্চয়পত্রে মানুষের চাহিদা বেশি, কোন ধরনের সঞ্চয়পত্র থেকে প্রকৃত সামাজিক নিরাপত্তার কাজ হচ্ছে, এর সুদহার কেমন হওয়া উচিত, বিনিয়োগ সীমা পরিবর্তনের দরকার আছে কি-না ইত্যাদি ঠিক করবে। আগামী দুই মাসের মধ্যে কমিটি প্রতিবেদন দেবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশেষ জনগোষ্ঠীর সুবিধার কথা চিন্তা করে সরকার বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্র চালু করেছে। কিন্তু অনেকেই এখন নিরাপদ ভেবে টাকা বানানোর জন্য সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। কার কত বিনিয়োগ আছে তারও কোনো ধারণা নেই বা জানার উপায় নেই। তবে এজন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ১ জানুয়ারি থেকে সঞ্চয়পত্র কেনাবেচা, এর সুদ আদান-প্রদানসহ সামগ্রিক কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হবে। গ্রাহকদের অনলাইনে সঞ্চয়পত্র কেনার আবেদন করতে হবে। এক লাখ টাকার ওপরে সঞ্চয়পত্রের মূল্য হলে তা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের সকলের ব্যাংক হিসাব থাকতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনতে হবে। এসব হয়ে গেলে সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে না। আবার কার নামে কত বিনিয়োগ আছে তা জানা যাবে।

এছাড়া ডাকঘর সঞ্চয়পত্র বাংলাদেশের ঐতিহ্য। এক সময় ব্যাংক ছিল না, তখন ডাকঘরের মাধ্যমে মানুষ বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। তবে ট্র্যাডিশন ধরে রাখার জন্য কী করা দরকার তাও পর্যালোচনা করবে কমিটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডাকঘর সঞ্চয়পত্র রয়েছে। জাপানে রয়েছে ব্যাপকভাবে। মানুষ বিশ্বাস করে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে অর্থ নিরাপদ থাকবে।

বর্তমানে চার ধরনের সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিবার সঞ্চয়পত্র। এক লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্রে ৫ শতাংশ উৎসে কর কাটার পর গ্রাহকরা মাসে ৯১২ টাকা সুদ পাচ্ছেন। পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দেওয়া হয় তিন মাস পরপর। এক লাখ টাকার বিপরীতে উৎসে কর কেটে প্রতি তিন মাসে দুই হাজার ৭৯৩ টাকা পান গ্রাহক। আর তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রে এক লাখ টাকার বিনিয়োগে দুই হাজার ৬২২ টাকা পান গ্রাহক। বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র পাঁচ বছর মেয়াদি। মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ সুদ পান গ্রাহক।