আদালত ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০১৮

মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন

অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী চট্টগ্রামে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনটি হওয়ার কথা ১০ তলাবিশিষ্ট। এ জন্য এ ভবনের ভিত ঢালাই দিতে হবে এমন শক্ত করে, যাতে ১২ তলা নির্মাণ করলেও কোনো সমস্যা না হয়। কিন্তু ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে ৭ তলা মানের ভিতের ওপর ৬ তলা। শুধু তাই নয়; নির্মাণ কাজের মাঝ পথে তথ্য গোপন করে ১২ তলা ভিতে ১০ তলা ভবন উল্লেখ করেই ব্যয় ২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা করা হয়। আর্থিক এই অনিয়মটি উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে।

৬৪ জেলা সদরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামে এ আদালত ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগ এবং গণপূর্ণ অধিদপ্তর দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। চট্টগ্রামের মতো ৬টি বড় জেলায় এ ভবন নির্মাণে অনিয়মের আশঙ্কা করছে আইএমইডি। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে সরকারি এ সংস্থাটি। একই সঙ্গে প্রকল্পভুক্ত অন্যান্য জেলায়ও অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়কে তা খতিয়ে দেখে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।

এদিকে বাস্তবায়নকারী সংস্থা গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। ফলে ৬৪ জেলা সদরে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনীতে চট্টগ্রামে আদালত ভবনের ব্যয় দ্বিগুণ প্রাক্কলনের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় দুর্নীতির শঙ্কা আরও বেড়ে গেছে।

প্রতিটি জেলা সদরে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় (একনেক) অনুমোদন পায় ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল। মূল প্রকল্পে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ২৭টি জেলায় ৬ তলা ভিতের ওপর ৫ তলা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন নির্মাণ ও ৩৭ জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা ছিল। প্রকল্পটির মোট ব্যয় (সরকারি অর্থায়ন) ধরা হয়েছিল ৭৩১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। পরে প্রয়োজনীয় জমি না পাওয়া ভবনগুলো ৬ তলা ভিতে ৫ তলার ভবনের পরিবর্তে ১২ তলা ভিতে ১০ তলা নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। ফলে ২০১১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকল্পটি প্রথম বারের মতো সংশোধন করা হয়। এ সময় ৩৪ জেলায় ভবন নির্মাণ ও ৩০ জেলায় ভবনের ভূমি অধিগ্রহণে প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ফলে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বেড়ে হয় ৮৭০ কোটি টাকা। এর পর ১৭৪ শতাংশ বা দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীতে ৪২ জেলায় ভবন নির্মাণ এবং ২২ জেলায় ভূমি অধিগ্রহণের কথা উল্লেখ ছিল। ২০০৯ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ হয়েছে ৫৭ শতাংশ। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ নতুন করে ২০২১ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে চায় গণপূর্ত অধিদপ্তর।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম সংশোধনীতে চট্টগ্রামে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট ভবন ১২ তলা ভিতের ওপর ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১২ তলা ভিতে ১০ তলা ভবনের পরিবর্তে ৭ তলা ভিতে ৬ তলা ভবন নির্মাণে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ চট্টগ্রামের ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের এ প্যাকেজটির ভৌত কাজ অর্ধেকেরও বেশি শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির দ্বিতীয় বার সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় সংশোধনীতে তথ্য গোপন করে ১২ তলা ভিতের ওপর ১০ তলা ভবন নির্মাণের কথা উল্লেখ করেই চটগ্রামের আদালত ভবনের নির্মাণ ব্যয় ৪৯ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও তথ্যেও অসামঞ্জস্যতা রয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ম সংশোধনীতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল এক ও অভিন্ন (১২ তলা ভিত্তিসহ) ডিজাইন ঠিক রেখে আদালত ভবন নির্মাণ করার। চট্টগ্রামের জন্য ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা। বাস্তবায়ন পর্যায়ে মূল পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ১২ তলা ভিতবিশিষ্ট ১০ তলা ভবন নির্মাণের পরিবর্তে ৭ তলা ভিতবিশিষ্ট ৬ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

প্রকল্পটির ১ম ও ২য় সংশোধনীতে চট্টগ্রামের জন্য ১২ তলা ভিতবিশিষ্ট ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ কাজের ব্যয় প্রাক্কলনে অনুমোদন রয়েছে। ১ম সংশোধনী অনুমোদনের প্রায় ২ বছর পর কার্যাদেশ প্রদান করা হয় এবং কার্যাদেশ প্রদানের প্রায় ৩ বছর পর ২য় সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদিত হয়। তাহলে ২য় সংশোধিত ডিপিপিতে চুক্তিভুক্ত কাজের পরিমাণ উল্লেখ না করে ১২ তলা ভিতবিশিষ্ট ১০ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ কাজের ব্যয় প্রাক্কলনে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২য় সংশোধনী একনেকে অনুমোদনের সময় প্রকৃত সত্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আড়াল করা হয়েছে বলে আইএমইডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাপ্তরিক প্রাক্কলন ও অগ্রগতির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, একক প্যাকেজটির কার্যক্রম বিভক্ত করা হয়েছে, চুক্তিতে অত্যাবশ্যকীয় কিছু কাজ বাদ দেওয়া হয়েছে, বাস্তব কাজের পরিমাণ ও পরিমাপ হ্রাস করা হয়েছে, ইন্টারনাল স্যানিটারি ও ওয়াটার সাপ্লাই এবং ইন্টারনাল ইলেকট্রিফিকেশন কাজের জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে একেবারেই অপ্রতুল অর্থের প্রাক্কলন করায় বর্তমানে অত্যধিক ব্যয় বেড়েছে। এতে প্রতীয়মান, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যক্তিস্বার্থে প্রকৃত তথ্য গোপন এবং প্রকল্প অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্দেশিত অনুশাসনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এধরণের অনিয়মের দায়ভার প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

আএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলায় ১২ তলা ভিতের ওপর কোথাও ১০, আবার কোথাও ৮ তলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে। বেশ কয়েকটি জেলায় বিশেষ করে ৬ জেলায় ভবন নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে। এসব জেলায় চট্টগ্রামের মতো একই অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত অন্যান্য জেলায়ও এ ধরনের অনিয়ম হয়েছে কি-না, জানা যায়নি।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জে আদালত ভবন নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি টাকা। এ ছাড়াও পিরোজপুরে ৬৭ কোটি, সুনামগঞ্জে ৬৯ কোটি, নোয়াখালীতে ৭৮ কোটি এবং যশোরে ৬১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। অন্যদিকে গোপালগঞ্জে ২৯ কোটি, ময়মনসিংহে ৩৭ কোটি, নারায়ণগঞ্জে ৩৮ কোটি, রাঙামাটিতে ৩৯ কোটি, বগুড়ায় ৩৩ কোটি টাকাও ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রকল্পের পচিালক ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী দেবাশীষ চন্দ্র সাহা বলেন, আইএমইডি না বুঝে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। দ্বিতীয় সংশোধনীতে তথ্য গোপন করে ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ সত্য নয়। তবে চট্টগ্রামে চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবনের ব্যয় প্রাক্কলন বেশি ছিল। ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হলেও নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি টাকা। সামান্য কিছু কাজ এখনও বাকি। এতে আরও ৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। তিনি বলেন, প্রাক্কলন সব সময় সঠিক হবে, তা ভাবা ঠিক না। এ প্যাকেজে (চট্টগ্রামে) যে অর্থ থাকবে তা ফেরত দেওয়া হবে।

আইএমইডির অতিরিক্ত সচিব বদরুল মজিদ বলেন, পরিদর্শনে বেশ কিছু অননিয়ম পাওয়া গিয়েছিল। আইএমইডি অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও বলেছে। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি-না জানা যায়নি।