অবৈধ উত্তোলনে বিপন্ন পরিবেশ

সিলেটের পাথররাজ্য

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮      

মুকিত রহমানী, সিলেট সীমান্ত থেকে ফিরে

অবৈধ উত্তোলনে বিপন্ন পরিবেশ

অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের ফলে ধসে পড়ছে কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি এলাকার লিলাই বাজার -ইউসুফ আলী

কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন (আরপিন) টিলাকে 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণা করেছিলেন সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবুল হাসনাত। ২৩ জানুয়ারি পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে টিলা ধসে ছয় শ্রমিকের মৃত্যুর পর ১৪ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় স্কুল মাঠে আয়োজিত কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মতবিনিময় সভায় তিনি ওই ঘোষণা দেন। কিন্তু তার এ ঘোষণা বন্ধ করতে পারেনি শ্রমিকের লাশের মিছিল। দেড় মাসের মাথায় ১ মার্চ আরও তিন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। সরেজমিন দেখা যায়, ১৩৭ একর ৫০ শতক জায়গা নিয়ে শাহ আরেফিন টিলাটি আগের চেহারায় নেই। ভেতর-বাইরে কঙ্কালসার। এখনও শ্রমিকরা গর্ত করে পাথর উত্তোলন করছেন। টিলা বলতে যা বোঝায়, আরেফিন টিলা এখন তা প্রমাণ করে না।

একাধিক পাথরখেকো চক্র দীর্ঘদিন ধরে টিলাটি কেটে পাথর উত্তোলন করে এটি বিপন্ন করে তুলেছে।

আরেফিন টিলা ধ্বংস প্রসঙ্গে সে সময় পুলিশিং সভায় সভাপতিত্বকারী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল বাছির সমকালকে বলেন, পাথর উত্তোলনে কোনো নিয়ম মানা হয় না। পাথরের লোভে বিশাল গর্ত করে উত্তোলন করা হয়। টিলাটি অস্থিত্বহীন হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, রক্ষকরাই এখন ভক্ষক সেজেছে; কারা পরিবেশ রক্ষা করবে।

সরেজমিন পরিদর্শনে জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তে পরিবেশ বিনিষ্টকারীদের কাছ থেকে এক সময় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে টাকা তুলতেন বিশ্বম্ভরপুর শিলডুয়ার বাসিন্দা বর্তমানে উত্তর কলাবাড়িতে বসবাসকারী তাজুল ইসলাম মোল্লা। পরিবেশ অধিদপ্তরের টাকা উত্তোলনের কারণে লোকজন তাকে পরিবেশ মোল্লা হিসেবে চেনে ও ডাকে। এখন তিনি আর পরিবেশ অধিদপ্তরের হয়ে টাকা তোলেন না, পুলিশের হয়ে টাকা তোলেন। যদিও তিনি এসবের মধ্যে নেই দাবি করে বলেছেন, তিনি পাথর কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত।

পাথররাজ্য বলে খ্যাত সিলেটের সীমান্তবর্তী চারটি উপজেলা- কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুরে ছোটবড় সাতটি পাথর কোয়ারি রয়েছে। কোয়ারি না হলেও পাথর উত্তোলন হয় এমন এলাকা রয়েছে ১০-১৫টি। উত্তর সীমান্তের কোম্পানীগঞ্জে দেশের বৃহৎ পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ ছাড়াও রয়েছে উৎমা কোয়ারি, শাহ আরেফিন টিলা, কালাইরাগ ও মাঝেরগাঁওয়ের পাথুরে জনপদ। সীমান্তের উত্তর-পূর্বের অন্য উপজেলা গোয়াইনঘাটে দেশের আরেক বৃহৎ কোয়ারি জাফলং ছাড়াও রয়েছে বিছনাকান্দি এবং কানাইঘাট উপজেলায় লোভাছড়া ও জৈন্তাপুরে রয়েছে শ্রীপুর পাথর কোয়ারি। পাথর উত্তোলনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ম মানা হয় না। যে যার মতো পাথর উত্তোলন করে আসছে। কখনও বেলচা দিয়ে, কখনও বোমা মেশিন কিংবা ফেলুডার দিয়ে আবার কখনও গর্ত করে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। ইচ্ছে মতো ও যত্রতত্র পাথর উত্তোলনের ফলে সীমান্তের ওই পাথররাজ্যের পরিবেশ আজ বিপন্ন। টিলা, পাহাড়, সমতল ভূমি, পানি, হাটবাজার, গ্রাম সব স্থানেই লেগেছে পাথর উত্তোলনকারীদের থাবা।

গত কয়েক বছর ধরে বোমা মেশিন নামের যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে এখন স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন। পরিবেশবিদ ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকারীরা আফসোস করে বলেছেন, পাথররাজ্যের পরিবেশ আমাদের এখন অভিশাপ দিচ্ছে। টিলাকে করা হয়েছে সমতল, সমতলকে গর্ত আর গর্তকে করা হচ্ছে পুকুর। পরিবেশের এমন অবস্থার জন্য সরকারি উদ্যোগের অভাব ও অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের দায়ী করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আবদুল করিম কিম। তিনি বলেন, সিলেট সীমান্তে মাটি কাটলেই পাথর মেলে। অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করায় পরিবেশ ও প্রতিবেশ নষ্ট হচ্ছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে দেখা যায়, ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি এলাকায় পাথর উত্তোলনের ফলে রোপওয়ের কয়েকটি খুঁটি হেলে গেছে। কিছু স্থাপনাও রয়েছে ঝুঁকিতে। বাংকার এলাকায় পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ থাকলেও সেখানে তা মানা হচ্ছে না। ভোলাগঞ্জ বাজারে ক্রাশার মিল ও পাথর ডাম্পিং করায় সেখানকার পরিবেশ বিপন্ন। দোকান ও ঘরবাড়িতে ঢুকছে ধুলাবালি। কোয়ারি এলাকার লিলাই বাজার, দয়ারবাজার ও গুচ্ছগ্রাম এলাকা একের পর এক বিলীন হচ্ছে।

লিলাই বাজারে কথা হয় ব্যবসায়ী দিদার আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ব্যক্তিমালিকানা ও সরকারি জায়গায় প্রভাবশালীরা পাথর তুলছে। গর্ত করে পাথর উত্তোলনের ফলে বাজারের ৫-৭টি দোকান ধসে পড়েছে। বাজারের পাশে ১০-২০ ফুট পর্যন্ত গভীর করে পাথর উত্তোলন করায় বেশকিছু দোকান ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। ওই দুটি বাজারের অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও বাসিন্দা সিলেটের বাইরের হওয়ায় কেউ প্রতিবাদ করেন না। মাঝে মধ্যে পরিবেশ নিয়ে যারা কথা বলেন তারাই আবার পরিবেশ ধ্বংস করে বলে অভিযোগ করেন ২ নম্বর পূর্ব ইসলামপুর ইউপি চেয়ারম্যান বাবুল মিয়া। তিনি সমকালকে বলেন, এলাকার পরিবেশ আজ বিপন্ন। প্রতিবাদ করেও রক্ষা করতে পারছি না। ধলাই নদীর নিচ থেকে পাথর উত্তোলন করায় সেতুটি হুমকিতে রয়েছে।

সিলেটের আরেক বৃহৎ পাথর কোয়ারি জাফলংয়ের পরিবেশও বিপন্ন। গত এক যুগে কোয়ারি ছাড়াও পুরাতন সংগ্রাম পুঞ্জি, মন্দিরের জুম ও কান্দুবস্তি এলাকা বিরাণভূমিতে পরিণত হয়েছে। বিগত দিনে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলনের ফলে মূল মানচিত্র থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে নয়াবস্তি, কান্দুবস্তি গ্রামের আংশিক এলাকা। একই সঙ্গে নদীতে বিলীন হয়েছে জাফলং চা বাগানের বেশ কিছু অংশ। জৈন্তাপুরের শ্রীপুর পাথর কোয়ারি ও খাসি নদী এলাকার পরিবেশও বিপন্ন। রাং পানি নদীর পাড় থেকে ছাগল খাউরি পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। লোভাছড়া কোয়ারি এলাকায় লোভানদীর দুই তীরে নির্ধারিত জায়গার বাইরে গিয়ে নদী সংলগ্ন ফসলি জমিতে ৪০-৫০ ফুট গর্ত করে পাথর উত্তোলন করতে দেখা যায়।

পাথর বহনকারী ট্রাক্টরের ধোঁয়া ও ধুলায় কোয়ারি সংলগ্ন ৫-৬টি গ্রামের পরিবেশ অত্যন্ত শোচনীয়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। গর্ত তৈরির কারণে বর্ষা মৌসুমে নদীর তীর ভেঙে পড়ে। এরই মধ্যে নয়াবাজার ও বাজার জামে মসজিদ এবং হারিছ চৌধুরী একাডেমির সম্মুখ, মূলাগুল বাজারের অধিকাংশ জায়গা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রভাব খাটিয়ে নদীর তীর কেটে, টিলা ও ফসলি জমিতে ৪০-৫০ ফুট গভীর গর্ত করে ইচ্ছে মতো পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে সেখানে।

পরিবেশের এমন অবস্থার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধের উদ্যোগের অভাবকে দায়ী করলেন বেলা সিলেট সমন্ব্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা থাকার পরও বোমা মেশিন চলে। পরিবেশ নষ্ট করা হয়। পাথররাজ্যের পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে আন্তরিক হতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, পরিবেশ রক্ষায় আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই, মামলা করি। বিজিবি ও উপজেলা প্রশাসন আমাদের সহায়তা করে। পাথররাজ্য কেন পরিবেশ ধ্বংসকারীদের হাত থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, যারাই এমন কাজ করে, তাদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। রয়েছে লোভও।

শাহ আরেফিন টিলায় বোমা মেশিন ধ্বংস :সিলেটের পাথররাজ্য নিয়ে সমকালে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশের মধ্যেই অভিযান চালানো হয়েছে কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলায়। গতকাল সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাসুদ রানার নেতৃত্বে পুলিশ ও বিজিবির সহযোগিতায় টাস্কফোর্স অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় ৮টি বোমা মেশিন ধ্বংস ও হোসেন আহমদ নামে এক বোমা মেশিন মালিককে আটক করা হয়। হোসেন জালিয়ারপাড়ের আবদুল আলীর ছেলে। তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগে ২৮ আগস্ট দেশের সর্ববৃহৎ কোয়ারি কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল লাইছ অভিযান চালিয়ে ৪টি বোমা মেশিন উদ্ধার ও ৪টি ধ্বংস করেন।

সীমান্ত এলাকার পাথররাজ্যে অবৈধভাবে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন, নেপথ্যের লোকজন ও পরিবেশ নিয়ে সমকাল শনিবার থেকে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করে। প্রথমদিন সংবাদ প্রকাশের পর দিন গতকাল টাস্কফোর্স অভিযান চালায়। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি জানান, গতকাল আটক হোসেন আহমদের বিরুদ্ধে এর আগেও মামলা করা হয়েছে। (শেষ)





পরবর্তী খবর পড়ুন : ধরলার শুশুক

মিস ইউনিভার্সের মুকুট জিতলেন ক্যাট্রিওনা গ্রে

মিস ইউনিভার্সের মুকুট জিতলেন ক্যাট্রিওনা গ্রে

২০১৮ সালের মিস ইউনিভার্সের মুকুট জিতে নিলেন ফিলিপাইনের প্রতিযোগী ক্যাট্রিওনা ...

ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, দলে রনি-আরিফুল

ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, দলে রনি-আরিফুল

পূর্ণাঙ্গ সিরিজ শেষ লেগে এসে ঠেকেছে। সিলেটে উইন্ডিজের বিপক্ষে টি-২০ ...

সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর: ড. কামাল হোসেন

সময় এসেছে রুখে দাঁড়ানোর: ড. কামাল হোসেন

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ...

সীমান্তে মিলল রাখালের লাশ

সীমান্তে মিলল রাখালের লাশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিরণগঞ্জ সীমান্তে আঃ রহিম নামে এক রাখালের লাশ উদ্ধার ...

বিকেল নাগাদ অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে পারে 'ফেথাই'

বিকেল নাগাদ অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে পারে 'ফেথাই'

বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত প্রবল ঘূর্ণিঝড় 'ফেথাই' সোমবার বিকেল নাগাদ ভারতের অন্ধ্র ...

লিভার সিরোসিস কখন হয়

লিভার সিরোসিস কখন হয়

লিভার সিরোসিস একটি জটিল রোগ। সাধারণত লিভারের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের কারণে ...

বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে ভারত

বাংলাদেশের নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে ভারত

ভারত আগামী ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিনিধিদল ...

চাঁদপুরে বাড়িতে দুই শিশুসহ পরিবারের ৪ জনের লাশ

চাঁদপুরে বাড়িতে দুই শিশুসহ পরিবারের ৪ জনের লাশ

চাঁদপুর সদর উপজেলায় একটি বাড়িতে দুই শিশুসহ একই পরিবারের চারজনের ...