পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ। পাশেই কেওড়া কাটা খাল। ভাটার সময় তখন। খালের পানি কমে গিয়ে কাদা দেখা যাচ্ছে। এখানে ওখানে গোলপাতা, কেওড়া গাছের সারি। বাঁধের দু'ধারেই লম্বা ঘরের সারি। এক পাশের ঘরগুলো মজবুত ভিতের ওপর। তবে খালের দিকের ঘরগুলো জীর্ণ ছনের। খুলনার কয়রা উপজেলার ১ নং কয়রার টেপাখালী গ্রামের এই এলাকায় আদিবাসী মুন্ডাদের বাস। এখানে বাস করে ৪২ ঘর মুন্ডা, যারা মূলত কৃষিজীবী। মাছ ধরতে ও বনে গিয়ে মধু সংগ্রহে খুব কমই যায় তারা।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি জমি কমে যাওয়ায় বর্তমানে টেপাখালীর মুন্ডাদের পেশাতেও পরিবর্তন আসছে। ইটভাটা শ্রমিকের কষ্টকর কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। অনেকেই জমি-ভিটে বেচে এলাকা ছাড়ছে।

হচ্ছে দেশান্তরী। শুধু টেপাখালী গ্রামেই নয়, আশপাশের সব মুন্ডা বসতিতেও দেখা মিলবে একই চিত্রের। খুলনা ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলার ৩০টি গ্রামে মুন্ডারা বসবাস করে।

মুন্ডারা নিজেদের 'হোরোকো' বলে থাকে, যার অর্থ মানুষ। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মুন্ডা সম্প্রদায়ের বসবাস। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে মুন্ডাদের সংখ্যা ১৫ হাজারের মতো। তারা কখন কীভাবে বাংলাদেশে এসেছে, তার সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে অনেকের ধারণা, মোগল ও ব্রিটিশ আমলে বন-জঙ্গল পরিস্কার করার জন্য মুন্ডাদের এদেশে নিয়ে আসেন স্থানীয় জমিদাররা। ১৮৭২ সালের আদমশুমারিতে মুন্ডারা রাজশাহী জেলার আদিবাসী হিসেবে নথিভুক্ত হয়। তবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মুন্ডাদের নিয়ে তেমন কোনো কাজ হয়নি। ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার ১২০টি পরিবার, শ্যামনগর উপজেলার ৩৫৩টিতে এক হাজার ৭৭০ জন ও খুলনার কয়রা উপজেলার ৩২০ পরিবারে এক হাজার ৫৩০ জন মুন্ডার বসতি পাওয়া যায়। তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার কারণে দিন দিন তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

গত বুধবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে টেপাখালীর বেড়িবাঁধে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল গণেশ মুন্ডার সঙ্গে। মাঠে ধান কাটার কাজ করছিলেন তিনি। হাত-পায়ে কাদা নিয়েই তিনি কথা বলছিলেন নিজেদের জীবনযাপন নিয়ে। গণেশ জানান, তাদের পূর্বপুরুষ বন-জঙ্গল পরিস্কার করে জমি বানিয়ে এই এলাকায় বসবাস শুরু করেন। এক সময় তাদের প্রায় পরিবারেরই পর্যাপ্ত জমি ছিল। কিন্তু প্রভাবশালীরা ছলচাতুরী করে সেসব জমি দখলে নিয়েছেন। অনেকে অভাবের কারণে জমি বেচে দিয়েছেন। এখন অধিকাংশ মুন্ডা পরিবারই হয় ভূমিহীন অথবা শুধু মাথা গোঁজার মতো বসতির অধিকারী। এক পুরুষ আগেও তাদের ১৬ বিঘা জমি ছিল। এখন আছে শুধুই ভিটে।

গণেশ জানান, এখন তারা এক কুড়ি (২০টা) মুঠি ধানছড়া কাটলে বিনিময়ে দুই মুঠি ধানছড়া পান। এক বেলায় কাটতে পারেন সাত কুড়ি ধানছড়া। এতে ১৪ মুঠি ধানছড়া মেলে, যাতে তাদের হিসাবে ৬/৭ পালি (মাপার পাত্র বিশেষ) ধান পাওয়া যায়। কেজি হিসাবে এর পরিমাণ ২০-২২ কেজি।

পেশায় গ্রাম পুলিশ গণেশ জানান, মাঠে এই কাজের সুযোগ মেলে বছরে পাঁচ-ছয় মাস। বাকি সময় তারা বলতে গেলে বেকার থাকেন। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন জীবিকার সন্ধানে নামছেন মুন্ডারা। ইটভাটায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন অসংখ্য মুন্ডা।

গত বুধবার টেপাখালীর মুন্ডাপাড়া ঘুরে দেখা যায়, কর্মক্ষম সদস্যরা কাজে গেছেন। পাড়ার বেশিরভাগ নারী মাঠের কাজে ব্যস্ত। বাড়ির পুরুষরা কয়েক মাসের জন্য চুক্তিতে ইটভাটার কাজে গেছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কাজ থাকলে মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম ২০-৩০ হাজার টাকা নেয় মুন্ডারা। পরে ভাটার মৌসুমে পাঁচ-ছয় মাসের জন্য শ্রমিক হিসেবে কাজ করে তা পরিশোধ করে। অনেকে কিছু টাকা জমিয়ে বাড়িতে পাঠায়। উত্তর বেতকাশীর মাঝেরআইট গ্রামের সুব্রত মুন্ডা জানান, ভাটার মৌসুম শুরুর আগে প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন বাস ভরে শ্রমিকরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় গেছেন ইট বানানোর কাজ করতে। প্রসঙ্গত নির্বাচনের কথা উঠলে সুব্রত মুন্ডা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের ইশতেহারে আদিবাসীদের জীবনমানের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার দিতে হবে।

মুন্ডাদের মধ্যে শিক্ষার হার খুব কম। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অংশগ্রহণ পড়াশোনায় বেশি। অধিকাংশ মুন্ডা ছেলেমেয়েই পড়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এ বিষয়ে কয়রা সরকারি মহিলা কলেজের ডিগ্রি শিক্ষার্থী সুমিলা মুন্ডা বলেন, প্রথমত সচেতনতার অভাবে শিক্ষার প্রসার কম। মনে করা হয়, পড়ার চেয়ে মাঠে কাজ করলে রোজগার বেশি হবে। এ ছাড়া পরিবারের বড় সদস্যরা বাইরের কাজে ব্যস্ত থাকায় সন্তানদের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না। তারা ঠিকমতো বিদ্যালয়েও যান না।

শিক্ষার হার কম হওয়ায় বিচিত্রমুখী পেশায় মুন্ডাদের অংশগ্রহণ কম। অনেক মুন্ডা পরিবারে কিছু জমি থাকলেও তাতে ধান ছাড়া অন্য ফসল হয় কম। এমনকি ভিটের জমিতে শাক-সবজি ফলানোও কষ্টকর। কারণ সেচের পানি মেলে না। তাদের পক্ষে গবাদি পশু পালন করাও মুশকিল। কারণ পশুকে খাওয়ানোর মতো ঘাস নেই। তা ছাড়া পানির অভাবও প্রচণ্ড।

স্থানীয়রা জানান, আইলা ও সিডরের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। কয়রার উত্তর বেতকাশী গ্রামে এমন কয়েক ঘর মুন্ডার খোঁজ মিলল, যারা সপরিবারে ভারত চলে গেছে।

মুন্ডাদের জীবন-জীবিকার এমন দুর্দশায়ও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য-সহযোগিতা মিললেও জীবনের টেকসই উন্নয়নের জন্য কেউ সেভাবে এগিয়ে আসছেন না। কয়েজ মুন্ডা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হাতে গোনা কয়েকজন বয়স্ক ভাতা ও বিধবা ভাতা পান। চাকরিতে কোটা প্রথা থাকলেও অধিকাংশ সময় তাদের সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভূমিহীন হওয়ায় এনজিওগুলোও তাদের ঋণ দিতে চায় না।

মুন্ডাদের নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করছে খুলনার স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ইনিশিয়েটিভ ফর রাইট ভিউ। এ সংস্থার সমন্বয়ক মেরিনা যুথি সমকালকে বলেন, মুন্ডাদের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে খাদ্য, জীবিকা, পানি ও শিক্ষার সুযোগ। মুন্ডারা কৃষিভিত্তিক কাজে অভ্যস্ত- এ কথা জানিয়ে মেরিনা যুথি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের সে সুযোগ কমে আসছে। এ জন্য এখন প্রয়োজন টেকসই বিকল্প জীবিকার খোঁজ।

মেরিনা জানান, বিকল্প জীবিকায় সবাইকে উৎসাহিত করতে তারা কয়েকটি পরিবারকে গরু পালনে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেন। ইউএনডিপির অর্থায়নে তাদের এ কাজে সহযোগিতা করে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা হ্যাকস-ইপার। তিনি বলেন, গরু দেওয়ার পর দেখা গেল, তাদের খাওয়ার পানির সংকট রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে পানির ট্যাঙ্ক বসিয়ে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। এর পর ঘাসের বিকল্প হিসেবে ঘরের উঠোনে ট্রলিতে বিশেষ পদ্ধতিতে গম চাষের পরামর্শ দেওয়া হলো। এ ছাড়াও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে গরুর গোবর থেকে কেঁচো সার তৈরির। তিনি জানান, তাদের উদ্যোগটি পাইলট প্রকল্প। এটি সফল হলে তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আরও বড় ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিষয়ে কয়রার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা বলেন, জেলা পরিষদ মুন্ডাদের জন্য একটি প্রকল্প পরিচালনা করে। এ ছাড়া বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে যুব উন্নয়ন অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মুন্ডারা চাইলে এসব কর্মসূচিতে অগ্রাধিকার পাবেন। প্রশিক্ষণের পর জীবিকা শুরুর ক্ষেত্রে প্রাথমিক পুুঁজিও সরকার সরবরাহ করবে।



মন্তব্য করুন