নজরদারিতে আসছে নয় শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

লক্ষ্য কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধ

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

আবু কাওসার

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্থিক লেনদেন রয়েছে এমন নয় শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেশে নিয়মিত কর দিচ্ছে কি-না বা অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত কি-না, তা খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সম্প্রতি এনবিআরের বোর্ড সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

সূত্র জানায়, বছরে তিন কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়- এ রকম ৯২১টি প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করেছে এনবিআর। এদের লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখা হবে। রাজস্ব বোর্ডের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেল থেকে এ বিষয়ে তদারকি করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারকে যথাযথ কর দিচ্ছে কি-না এবং বিদেশে টাকা পাচার করছে কি-না, তা যাচাই করা হবে। এ জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নামে আলাদা ফাইল খোলা হবে। রাজস্ব বোর্ডের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর ধরন ও লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধাপে ধাপে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে নিরীক্ষার আওতায় আনা হবে।

এনবিআর সূত্র জানায়, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সভায় অর্থ পাচার ঠেকাতে বিদ্যমান ট্রান্সফার প্রাইসিং আইনকে সক্রিয় করার নির্দেশ দেন এনবিআর চেয়ারম্যান। ওই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ শুরু করেছেন ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলের কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকার পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে এনবিআরের ট্রান্সফার সেলকে পুনর্গঠন করা হয়। এই সেলের সমন্বয়ক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের যুগ্ম পরিচালক শাব্বির আহমেদ বৈঠকে জানান, বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে এমন ৯২১ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বহির্বিশ্বের সঙ্গে লেনদেন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে এদের লেনদেনের তথ্য খতিয়ে দেখা হবে। এ লক্ষ্যে কয়েকটি টিম কাজ শুরু করেছে।

জানা যায়, তথ্য সংগ্রহে একটি ফরম তৈরি করা হয়েছে। এতে কোম্পানির ব্যবসার ধরন, দুই বছরের লেনদেনের তথ্য, বার্ষিক মুনাফা, কোম্পানির সম্পদ, কর পরিশোধের বিবরণসহ প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখের ঘর রয়েছে। তালিকাভুক্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কাছে এসব তথ্য চাওয়া হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে কোম্পানিগুলোর কাছে আলাদা চিঠি পাঠানো হবে।

ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলের এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, কোম্পানিগুলোর বিদেশে অবস্থিত মূল কোম্পানি কিংবা অন্য কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। এর মাধ্যমে তাদের কর ফাঁকির তথ্য উদ্ঘাটন করা যাবে। তবে এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার বলে জানান তিনি।

অর্থ পাচার বন্ধে ছয় বছর আগে ট্রান্সফার প্রাইসিং নামে আইন প্রণয়ন করে সরকার। মূলত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো অন্য দেশে তাদের শাখার মাধ্যমে পণ্যের মূল্য কারসাজি করে মূলধন বা সম্পদ হস্তান্তর করে, যা ট্রান্সফার প্রাইসিং নামে পরিচিত। কর ফাঁকি রোধ এবং অবৈধ উপায়ে টাকা পাচার ঠেকাতে ২০১২ সালে এ আইন করা হয়। তবে এ আইনের প্রয়োগ দেখা যায়নি।

সূত্র জানায়, প্রতিবছর কর ফাঁকির মাধ্যমে কী পরিমাণ টাকা দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে পাচার হয়, তার কোনো গবেষণালব্ধ তথ্য নেই। জানা যায়, বাংলাদেশে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের প্রকৃত আয় গোপন করে কম আয় দেখিয়ে মুনাফার একটি অংশ তার দেশে নিয়ে যায়। বিভিন্ন দেশে তাদের শাখা অফিসের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য কারসাজি করে অবৈধ পন্থায় মূলধন পাঠাচ্ছে। দেশি প্রতিষ্ঠানও এ কাজে পিছিয়ে নেই। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও উল্লিখিত আইনটি করা হয়।

এনবিআর সূত্র বলছে, বাংলাদেশের বেশির ভাগ পণ্য আমদানিতে প্রকৃত মূল্য ঘোষণা করা হয় না। যে কারণে বিপুল পরিমাণ রজস্ব ফাঁকি হয়। ফাঁকি দেওয়া টাকার বড় অংশই চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। অর্থ পাচারের ঘটনা বেশি ঘটছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পণ্যমূল্য কারসাজির মাধ্যমে।

এনবিআর সূত্র বলেছে, শুধু বহুজাতিক কোম্পানি নয়, অনেক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও কর ফাঁকি দিয়ে দেশ থেকে টাকা পাচার করছে। দেশি এসব প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে অডিটের আওতায় আনা হবে। এ ছাড়া আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের আড়ালে আন্ডার এবং ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি দিয়ে দেশ থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার হচ্ছে।