একুশে বইমেলা

বৈচিত্র্যের খোঁজে তরুণ লেখক

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

বছর বছর বাড়ছে বইয়ের সংখ্যা। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লেখকের সংখ্যাও। এদের মধ্যে অনেকেই রেখে চলেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। তারপরও প্রতিবার অমর একুশে গ্রন্থমেলা এলেই প্রশ্নটি সামনে আসে- কেমন লিখছেন তরুণরা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই ধরনের উত্তরই মিলল। তবে একটি কথা জানা গেল, বৈচিত্র্যময়তা রয়েছে তরুণদের লেখার বিষয়ে, বাক্যগঠনে। তবে অনেক তরুণের লেখা দুর্বলও। এ দুর্বলতা কাটাতে পাঠাভ্যাস বাড়ানোর তাগিদ দিলেন তাদের পূর্বসূরি ও প্রকাশকরা।

এবারের মেলায় তিনটি নতুন বই আসছে তরুণ কথাসাহিত্যিক মোজাফ্‌ফর হোসেনের। এরই মধ্যে পাঞ্জেরী থেকে 'পাঠে বিশ্নেষণে বিশ্ব গল্প' ও গ্রন্থকুটির থেকে 'বাংলা সাহিত্যের নানা দিক' শিরোনামে দুটি প্রবন্ধের বই এসেছে মেলায়। কিছুদিনের মধ্যেই অগ্রদূত থেকে প্রকাশিত হবে আবুল হাসান সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া পাণ্ডুলিপির গল্পগ্রন্থ 'পরাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা'। তিনি জানালেন, নিজের লেখায় যাপিত সময়ের গল্পকে তুলে ধরতে চান। যার জন্য সমাজকে নয়, ব্যক্তি প্রাধান্য পাবে। যে ব্যক্তি নানা জটিলতায় নিজের জীবন কাটিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তার লেখায় ব্যক্তিকে আঁকতে চান।

কবি নওশাদ জামিলের এবার নতুন কোনো বই আসছে না। তবে তার লেখা ভ্রমণকাহিনী 'লঙ্কাপুরীর দিনরাত্রির' নতুন সংস্করণ আসছে পাঞ্জেরী থেকে। তিনি বললেন, বাংলা সাহিত্যের বিশালতা সামনে রেখে নতুন কিছু সৃষ্টি করা কঠিন। তারপরও নিজের লেখায় তিনি চলতি সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। এ দৃষ্টিভঙ্গিই লেখকের রচনাকে অন্য লেখকদের চেয়ে ভিন্ন করে তোলে।

পিয়াস মজিদের সাতটি নতুন বই আসছে মেলায়। এগুলোর মধ্যে দুটি কাব্যগ্রন্থ- 'ক্ষুধা ও রেস্তোরাঁর প্রতিবেশী' (প্রথমা) ও 'প্রেমপিয়ানো' (পাঞ্জেরী), দুটি প্রবন্ধের বই 'জীবনানন্দ :আমার অসুখ ও আরোগ্য' (ঐতিহ্য) ও 'বঙ্গবন্ধুর বয়ানে সাহিত্য ও অন্যান্য' (পার্ল), সাক্ষাৎকার সংকলন 'সাক্ষাৎকার ১৭' (মাওলা ব্রাদার্স), ব্যক্তিগত গদ্যের সংকলন 'নির্জন নোটবুক' (সময় প্রকাশন) এবং কিশোরতোষ বই 'ভরদুপুরের বিভূতিভূষণ' (কাঠপেন্সিল প্রকাশনী, পরিবেশক-অন্যপ্রকাশ)। তিনি বললেন, সব সময়ই নতুনত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি। ভাষার ব্যবহারে সচেতনতা অবলম্বন করে লেখার চেষ্টা করি, যাতে কোনো লেখায় একই শব্দ যেন বারবার না আসে।

এবার স্বকৃত নোমানের দুটি বই রয়েছে। একটি উপন্যাস 'মায়ামুকুট' (অন্যপ্রকাশ), অন্যটি প্রবন্ধের বই 'আঠারো দুয়ার খুলে' (পাঞ্জেরী)। তিনি বললেন, বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে লেখার চেষ্টা করি। বিষয়, ভাষা চূড়ান্ত না হলে লিখতে বসেন না তিনি। যার কারণ পাঠককে সব সসয় নতুন কিছু দেওয়ার চেষ্টা।

কবি মাজহার সরকারের এবার কবিতার বই 'চিৎকার রণিত হূৎপিণ্ড' (চন্দ্রবিন্দু)-এর পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস 'নেমকহারাম' (তাম্রলিপি) প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জানালেন, ব্যক্তি মানুষের বাইরে গণমানুষের কথা বলার চেষ্টা করে থাকেন। ব্যক্তিগত হতাশা না লিখে, গণমানুষের হতাশা নিয়ে লেখার মধ্য দিয়ে সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার স্মারক রাখার চেষ্টা করছেন।

তরুণদের লেখার বিষয়ে অনুপম প্রকাশনী স্বত্বাধিকারী মিলনকান্তি নাথ সমকালকে বলেন, প্রতিশ্রুতিশীল, সম্ভাবনাময় অনেক তরুণ এখন লিখছেন। তবে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে তারা তড়িঘড়িভাবে শেষ হওয়া লেখা নিয়ে প্রকাশকদের কাছে আসেন। সে সময় তাদের পাণ্ডুলিপি সঠিকভাবে নির্বাচন ও সম্পাদনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভালো লেখকের সংখ্যা কিন্তু সেভাবে বাড়ছে না। আর তরুণদের লেখার চেয়ে বেশি বেশি পড়ার পরামর্শ দিলেন জ্যেষ্ঠ এই প্রকাশক।

একই কথা বললেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ। তিনি বললেন, স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে নিজের কণ্ঠস্বর নিয়ে দাঁড়ানো লেখক-কবির দেখা সেভাবে মেলেনি। তবে অনেকেই দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। হয়তো তাদের মধ্যেই কেউ কেউ নিজের কণ্ঠস্বর নিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন স্বগৌরবে। আর এ জন্য লেখার চেয়ে লেখককে বেশি পড়তে হবে।

এদিকে, গতকাল মেলায় এসেছে মাহবুব আজীজের নতুন উপন্যাস 'এইসব কলহাস্য'। কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত উপন্যাসটিতে লেখক সবকিছুর পরেও মানুষের বেঁচে থাকার আকুলতার কথা সুচারুভাবে তুলে ধরেছেন। ইমরান হোসেন পিপলুর প্রচ্ছদে বইটির মূল্য ২২৫ টাকা।

লেখক বলছি... মঞ্চ :গতকাল 'লেখক বলছি...' মঞ্চে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত নিজের লেখা গবেষণাগ্রন্থ 'সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি' নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন সমকালের উপসম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত। তিনি বলেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে হরতালের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি ও অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাওয়ার কারণ বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের হরতালের মূল্যায়ন ও বিশ্নেষণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সাত দশকের রাজনীতির বিবর্তনও উঠে এসেছে।

এ ছাড়া গতকাল কবি ফরিদ কবির 'আমার গল্প' (আগামী), জাহানারা পারভীন 'স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি' (নালন্দা), চঞ্চল আশরাফ 'নির্বাচিত গল্প' (বৈভব) এবং মন্দিরা এষ তার 'অরণ্য মিথের পৃষ্ঠা' (জেব্রাক্রসিং) বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হন।

নতুন বই :একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলার ষষ্ঠ দিনে প্রকাশিত হয়েছে নতুন ১৫২টি বই। এর মধ্যে গল্প ৩১, উপন্যাস ২২, প্রবন্ধ ৪, কবিতা ৪০, গবেষণা ২, ছড়া ১০, শিশুসাহিত্য ১, জীবনী ৪, মুক্তিযুদ্ধ ৮, নাটক ১, বিজ্ঞান ৪, ভ্রমণ ৩, ইতিহাস ২, রাজনীতি ১, স্বাস্থ্য ২, রম্য/ধাঁধা ১, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ৩ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর এসেছে ১৩টি নতুন বই।

এর মধ্যে রয়েছে- আতিউর রহমানের 'প্রান্তজনের স্বপক্ষে' (আলোঘর), অধ্যাপক ড. প্রাণ গোপাল দত্তের 'পদোন্নতির সাতকাহন' (অনিন্দ্য), মিরাজুল ইসলামের 'নার্সিসাসে প্রজাপতি :মুর্তজা বশীরের জীবানালেখ্য' (প্রতীক), মলয় পাঁড়ের ভাষান্তরে 'লাভ ইন দ্য রেইন নাগিব মাহফুজ' (অবসর), আলতাফ পারভেজের 'কাশ্মীর ও আজাদির লড়াই' (ঐতিহ্য), হায়দার বসুনিয়ার 'কবিরের ভিটা-মাটি' (বিশ্ব সাহিত্য ভবন), আবু নাছের টিপুর 'বেলা অবেলা' (অন্বেষা), মাহবুব সাদিকের 'তিন শিকারীর গল্প' (শিশু গ্রন্থকুটির), মোহাম্মদ নাসিমের 'সংসদের তিন প্রজন্ম' (আগামী), পলাশ মাহবুবের 'কম বয়সি সন্ধ্যা' (কথাপ্রকাশ), নাসরীন জাহানের 'এসেছি সূর্যাস্ত থেকে' (পাঞ্জেরী), জাহিদ নেওয়াজ খানের 'দ্য গ্রিণ ম্যান' (আবিস্কার), মোস্তফা মামুনের 'রাজু ভাই মাইনাস শেলী আপা' (অনন্যা), তুহিন আহমদ পায়েলের ভ্রমণকাহিনী 'সুবর্ণ গ্রাম থেকে সুবর্ণভূমি' (ঠিকানা গ্রুপ অব পাবলিকেশন্স অ্যান্ড মিডিয়া) এবং তাসলিমা জামান পান্নার 'নীল অপরাজিতা' (বিদ্যাপ্রকাশ)।

মূলমঞ্চের আয়োজন :গতকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় :জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল হাসনাত। আলোচনায় অংশ নেন বিমল গুহ, গোলাম কিবরিয়া পিনু ও শোয়াইব জিবরান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি আসাদ চৌধুরী।

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি ফারুক মাহমুদ ও ফারহান ইশরাক। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আশরাফুল আলম ও শিরিন ইসলাম। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবুবকর সিদ্দিক, স্বপ্না রায়, আজগর আলীম, সফিউল আলম রাজা ও অনিমা মুক্তি গোমেজ।

আজকের আয়োজন :আজ মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেলে মেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'ভাষাবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই :জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন ড. সৌমিত্র শেখর। আলোচনায় অংশ নেবেন অধ্যাপক মনিরুজ্জামান, জীনাত ইমতিয়াজ আলী, শহীদ ইকবাল ও তারিক মনজুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।