কিশোরগঞ্জে যুবলীগ নেতা ইউসুফ মনি হত্যা

নেপথ্যে পেশাদার খুনি শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জে যুবলীগ নেতা ইউসুফ মনিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার প্রায় দুই সপ্তাহ পরও পুলিশ কোনো অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এ ঘটনায় মনির পরিবার ও রাজনৈতিক কর্মীরা ক্ষুব্ধ। পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, কিশোরগঞ্জ শহরে সাম্প্রতিক সময়ে একদল মুখোশধারী পেশাদার সন্ত্রাসীর আবির্ভাব ঘটেছে। তারা খুন-খারাবিসহ নানা অপরাধে জড়িত। মনি হত্যাকাণ্ডেও জড়িত এই বাহিনী। তবে পুলিশ তাদের কাউকেই ধরতে পারছে না।

গত ২৫ জানুয়ারি রাতে মুখোশধারী ২০-২৫ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী শহরের জনবহুল ব্যবসায়িক এলাকা ঈশা খাঁ সড়কে নৃশংসভাবে হত্যা করে মনিকে। এ ঘটনায় মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের নৃশংস হামলায় মনির ছোট ভাই কিশোরগঞ্জ পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইয়াকুব সুমনও গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ শহরে গত দুই বছরে এই মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা অন্তত ৪০টি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলায় শতাধিক নারী-পুরুষ আহত হয়েছে। খুন হয়েছে অন্তত আটজন। ভাড়াটিয়া এই সন্ত্রাসী বাহিনী শহরে বিভিন্ন সহিংস ঘটনার জন্য দায়ী বলে সংশ্নিষ্টরা বলছেন।

এসব সন্ত্রাসীর তাণ্ডবে কিশোরগঞ্জের প্রধান ব্যবসায়ী এলাকা ঈশা খাঁ সড়ক, গৌরাঙ্গ বাজার, বড় বাজার, পুরানথানা বাজার, তেরিপট্টি ও বড় বাজারের ব্যবসায়ীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। এই দলে মুখোশ পরিহিত ৫-৭ জন ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী থাকে। তাদের নেতৃত্বেই কার্যত বিভিন্ন এলাকার বখাটে যুবক-তরুণরা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে খুনসহ মানুষকে নৃশংসভাবে আহত করে, সৃষ্টি করে ভীতিকর অবস্থা। ফলে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি শহরের মানুষজন আতঙ্কে থাকেন। অনেকে সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে ভয় পায়।

বাজারের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা জানান, গত এক বছরে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সাত অটোচালককে খুন করে অটোরিকশা চুরির ঘটনা ঘটেছে। মনি খুনের পর এসব হত্যাকাণ্ড নিয়ে শহরের হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সর্বত্র নতুন করে আলোচনা চলছে।

স্থানীয়রা বলছেন, এসব সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের গ্রুপিং-লবিংয়ের সুযোগে কোনো কোনো প্রভাবশালী নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকেন। চিহ্নিত এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হলে শহরের সন্ত্রাস সমূলে উৎপাটন হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও বলছে, শহরের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলো একই সূত্রে বাঁধা। একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী দল সবগুলো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তাদের ধারণা। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান রয়েছে বলে তাদের গ্রেফতার করতে সময় লাগছে।

মনি হত্যার পর তার স্ত্রী আবেদা আক্তার শিখা বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে কিশোরগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তাদের মধ্যে শহরের অস্ত্রধারী চিহ্নিত সন্ত্রাসী রয়েছে ৭ জন। তাদের সবাই ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত।

পুলিশ জানায়, মনি হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি নিয়াজ তিনটি হত্যা মামলাসহ ৮টি মামলার আসামি, রকিব খুনসহ ৭টি মামলার আসামি, নয়ন ৫টি মামলার আসামি, রাজিব ৩টি মামলার আসমি, ব্ল্যাক আক্কাছ আলী খুনসহ তিনটি মামলার আসামি। এ ছাড়া আসামি রিয়াদ, আসিফ মিয়া মুরসালিন ও মুছা একাধিক মামলার আসামি। পুলিশের ধারণা, কিশোরগঞ্জ শহরে গত আড়াই বছরে অন্তত ৮টি হত্যাসহ ২০টি বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় তারা সরাসরি জড়িত।

জেলা আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, নিহত মনি জেলার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি প্রয়াত জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তাই তার মৃত্যুকে সাধারণ নেতাকর্মীরা মেনে নিতে পারছেন না। কিশোরগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আসাদুজ্জামান খান মনির বলেন, পুলিশ এদের ধরতে পারছে না কেন? চিহ্নিত ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ২৫ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে বিচারের ব্যবস্থায় নিলে শহরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে কেউ সাহস পাবে না।

মনির স্ত্রী শিখা বলেন, ১২ দিনেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তাদের একমাত্র ছেলে সিয়াম কিশোরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। গভীর রাতে সে বাবা বলে কেঁদে ওঠে। এ হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি। কিশোরগঞ্জ-১ আসনে পুনর্নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি বলেছেন, মনি হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচারসহ কিশোরগঞ্জকে সন্ত্রাসমুক্ত করা হবে। কোনো সন্ত্রাসীর স্থান হবে না কিশোরগঞ্জের মাটিতে।

এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবু বকর ছিদ্দিক বলেন, জড়িতদের গ্রেফতারে পুলিশ কাজ করছে। আসামিদের বেশিরভাগ হচ্ছে পেশাদার খুনি। তারা একাধিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। সবগুলো ঘটনাকে একত্রিত করে তদন্ত করা হচ্ছে। আসামিরা খুব ভয়ঙ্কর প্রকৃতির। তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কেও তাদের ধারণা রয়েছে। মূল আসামিরা তাদের ব্যবহূত মোবাইল ফোন বাসায় রেখে চলে গেছে। তবে গ্রেফতার সময়ের ব্যাপার। সবাইকে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনা হবে। এ জন্য একটি বিশেষ দল মাঠে কাজ করছে।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ জানান, হত্যাকারীদের কোনো ছাড় নেই। খুনিদের কোনো দল নেই। পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোনো অপরাধীকে ছাড় দেবে না।