চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদী। আর এই নদীর প্রধান দুই শাখা খাল হচ্ছে রাজাখালী ও চাক্তাই খাল। নগরের বিদ্যমান জলাবদ্ধতা নিরসনের অনেকটাই নির্ভর করে এই দুই খালের ওপর। কিন্তু কর্ণফুলীর মতো দখল হয়ে গেছে এ দুই খালের অধিকাংশ জায়গা। দুটি খালের প্রায় দুই একর জায়গা দখল করে আছে ১০২ জন দখলদার। সংশ্নিষ্টদের মতে, বর্তমান বাজার মূল্যে যা শত কোটি টাকার জায়গা। ২০১৫ সালে খাল দুটির অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তালিকা তৈরি করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের উচ্ছেদে নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। দখলদারদের তালিকায় আছে খালটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা সিটি করপোরেশনের নামও। তারাও তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেয়নি। শিগগির দখলদারদের উচ্ছেদ করা না হলে চট্টগ্রামের মানচিত্র থেকে খালগুলো হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন সমকালকে বলেন, 'রাজাখালী ও চাক্তাই খালকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তারা যখন কাজ করবে তখন দখলদারদের উচ্ছেদ করবে।' একই কথা বলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা।

নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। প্রকল্পটির পরিচালক ও চউকের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ মঈনুদ্দিন সমকালকে বলেন, 'প্রকল্পের আওতায় এখন খালগুলো পরিস্কারের কাজ করা হচ্ছে। খালের দুই পাশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ ও সড়কের কাজ শুরু হলে দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।'

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরের পানি নিস্কাশনের প্রধান মাধ্যম চাক্তাই খালের ১৯ হাজার ৯৮২ বর্গফুট জায়গা দখল করে আছে ৪৮ দখলদার। চাক্তাই খালের ডান তীরে বাকলিয়া এলাকায় চাক্তাই খালের ৩৭২ বর্গফুট জায়গা দখল করে দোকান গড়ে তুলেছেন আমির হোসেন, আবদুল বারেক, জসিম উদ্দিন, হাজি আমিনুল হক, হাজি রেজোয়ান ইসলাম, আহম্মদ হোসেন ও বাহাদুর। দুই হাজার বর্গফুট জায়গা অবৈধভাবে দখল করে ঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন সাবেক কাউন্সিলর শহীদুল আলম, মো. ইউছুফ, মো. রফিক, শামসুল হক, বশির আহম্মদ, মো. ইউসুফ, আবদুছ ছালাম, নুরুল আমিন, জামাল আহাম্মদ, মাহবুব হোসেন, মো. নাছের ও মনির আহম্মদ।

এ ছাড়া আবাসন প্রতিষ্ঠান সিপিডিএল দখল করেছে ৮০ বর্গফুট। খাল ভরাট করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন গড়ে তুলেছে চারতলা ভবন। বর্তমানে রাজস্ব সার্কেল-২-এর কার্যালয় রয়েছে এখানে। চাক্তাই খালের ১৩ হাজার ১২৫ বর্গফুট জায়গা ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহদ্দারহাট বাজার। বাজারটির পরিচালনায়ও রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা সমকালকে বলেন, 'সিটি করপোরেশন খাল ভরাট করে স্থাপনা করেছে- এমন কিছু জানা নেই। তেমন হলে সিটি করপোরেশনের ভবন সরিয়ে নেওয়া হবে।'

চাক্তাই খালের এক হাজার ৫৩০ বর্গফুট জায়গার ওপর রয়েছে এনামুল হকের পাঁচতারা বাণিজ্যালয়, মোহাম্মদ আলমগীরের মাওলা স্টোর, জয়নাল আবেদীন আজাদের জেবি ট্রেডার্স, বাদল দেবের এ এম ট্রেডিং, দেব প্রসাদ চৌধুরীর মেসার্স সুভাষ স্টোর, আবদুল করিমের মামুন ব্রাদার্স, স্বপন বিশ্বাসের হাজি ছালাম অ্যান্ড সন্স, মঈনুল আলমের টিনের দোকান, মো. শাহজাহানের এস কে ট্রেডিং, আবু বক্কর চৌধুরী ও নীল কৃষ্ণা দাশ মজুমদারও গড়ে তুলেছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া কাঠ ও টিনের বেড়া দিয়ে খালের জায়গা দখলে রেখেছেন পাঁচ ব্যক্তি। মো. ইউছুফ ৮৫ বর্গফুট, ছালেহ আহম্মদ অ্যান্ড সন্স ৮৫ বর্গফুট, আবু মিয়া চৌধুরী ১০০ বর্গফুট, মো. মনির ১০০ বর্গফুট এবং আবু ছুফিয়ান ১২০ ফুট দখল করে রেখেছেন।

চাক্তাই খালের বাম তীরে দখলে রয়েছে প্রায় একহাজার ২৭৬ বর্গফুট জায়গা। এ স্থানের অবৈধ দখলদাররা হলেন- মাজহার আলী ইসলাম, মো. ইয়াকুব খান, স্বপন চৌধুরী, সিরাজ মিয়া, আবুল কালাম, নুর মোহাম্মদ, আলমগীর হোসেন ও আনোয়ার হোসেন। এখানে ২৮৬ বর্গফুট জায়গা দখল করে একতলা ভবন গড়ে তুলেছেন নূর মোহাম্মদ। ৫৮০ বর্গফুট জায়গার ওপর আলমগীর হোসেনের একতলা ভবন ও ৫০ বর্গফুট জায়গার ওপর আনোয়ার হোসেনের টিনশেড ঘর গড়ে উঠেছে।

মধ্যম চাক্তাই এলাকায় খালের অংশ দখল করে গড়ে তোলা পাঁচতারা বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী এনামুল হক বলেন, '২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে একবার এটি উচ্ছেদ করা হয়েছিল। পরে খালের জায়গায় দোকান কিছুটা বর্ধিত করেছি। স্থাপনা সরিয়ে নিতে এখনও পর্যন্ত কোনো নোটিশ পাইনি।'

চাক্তাই খালের ৮০ বর্গফুট জায়গা দখল করে টিনশেড ঘর তুলেছেন সাবেক কাউন্সিলর শহীদুল আলম। তবে তিনি সমকালকে বলেন, 'খালের জায়গা কেন দখল করতে যাব? কখন এই জরিপ করেছে তাও জানি না। যদি দলিল অনুযায়ী জায়গা পায়, তাহলে নিয়ে যাবে।'

চাক্তাই চালপট্টি এলাকায় খালের জায়গা দখল করে মেসার্স সুভাষ স্টোর নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন দেব প্রসাদ চৌধুরী। তিনি সমকালকে বলেন, 'চাক্তাই খালের কোনো জায়গা দখল করিনি। নিজেদের জায়গার ওপর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছি।'

এদিকে ৫৪ জনের দখলে রয়েছে চট্টগ্রাম নগরের আরেকটি প্রধান খাল রাজাখালী খালের এক দশমিক ৩২ একর জায়গা। রাজাখালী খালের দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ের ২৫ হাজার ৮৮৫ বর্গফুট জায়গা দখল করে সেমিপাকা ঘর ও তেলের গোডাউন গড়ে তুলেছেন ফরিদ চেয়ারম্যান, ফরিদ সওদাগর, আক্তার সওদাগর, শফিউল আজম, বাবুল হাজি, মো. নাছের ও আবুল কালাম। রাজাখালী খালের উত্তর-পশ্চিম পাড়ে ১৮ হাজার ৭৩৫ বর্গফুট জায়গা দখল করে সেমিপাকা ঘর, গোডাউন, রাইস মিল, ভবন, খাদ্যের মিল ও মাদ্রাসা গড়ে তুলেছেন হাজি সিরাজুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, হাজি আবদুল ছোবহান গং, হাজি নবী হোসেন সওদাগর, বাদশা মিয়া চৌধুরী, সালাউদ্দিন, টাইগার ফরিদ, জামাল সওদাগর, পিউরিটি ময়দার মিল, ওসমান সওদাগর, আশু বাবু, কালাম সওদাগর, মো. এমরান, শাহীন স্টোর, গফুর ভিউ, জাফর, সিরাজ, আবদুল খালেক, আবদুল মালেক ও নুরুল ইসলাম সওদাগর।

রাজাখালী খালের দক্ষিণ-পূর্ব পাড়ে ১৩ হাজার ১৯২ বর্গফুট খালের জায়গা দখল করে সেমিপাকা কাঁচাঘর তুলে ভাড়া দিয়েছেন মো. কালাম, মো. জাহাঙ্গীর, মো. নেজাম, নুরুল ইসলাম, মো. জাহাঙ্গীর, জাগীর হোসেন, সেকান্দার, ভোলা মাঝি, জানে আলম, মরিয়ম বেগম, হালিমা বেগম, আবুল কাসেম, মো. আলী সাহেব, মো. ইসমাইল গং (২১ জন), রবি আলী, হাফিজিয়া মাদ্রাসা, মসজিদ, কামাল মাঝি, মোজাহার কোম্পানি, হাজি আবুল কামাল ও জয়নাল আবেদীন আজাদ।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, 'তালিকা তৈরি করে ফাইলবন্দি করে রাখলে সে তালিকার কোনো মূল্য নেই। শিগগির খাল থেকে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা না হলে একদিন খালগুলো চট্টগ্রামের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।'

২০১৪ সালের ১৬ জুলাই নদী-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের এক বৈঠকে চাক্তাই ও রাজাখালী খালের সীমানা নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই বছরের ২০ অক্টোবর সীমানা নির্ধারণ করে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয় নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। কিন্তু সীমানা নির্ধারণে কেটে যায় প্রায় এক বছর। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে জমা দেয় চাক্তাই খাল ও রাজাখালী খাল সীমানা নির্ধারণ-সংক্রান্ত গঠিত কমিটি।



মন্তব্য করুন