বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (বিআইএমটি) থেকে পাস করা আটজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার জাহাজে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। চাকরির জন্য তাদের স্বীকৃত কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনাপত্তি সনদ দরকার ছিল। এ সময় তারা একটি বিজ্ঞাপনে দেখেন, 'ভিসা সার্ভিস লিমিটেড' এই সুযোগ করে দিচ্ছে। কিছু টাকার বিনিময়ে প্রশিক্ষণ ও সনদসহ চাকরি পাইয়ে দেওয়ার পুরো দায়িত্বই তারা পালন করবে। আগ্রহী শিক্ষানবিশ প্রকৌশলীরা প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কয়েক দফায় তারা মোট ১৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু টাকা নেওয়ার পর অফিসে তালা ঝুলিয়ে পালিয়ে যান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম শরীফ। এতে বিপাকে পড়েন চাকরিপ্রার্থীরা। একপর্যায়ে জানা যায়, জাহাজে চাকরি দেওয়ার নাম করে টাকা হাতিয়ে নেওয়াই শরীফের পেশা। আরও অনেকেই তার এমন প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ মামলার তদন্ত করে। তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সুহৃদ দে সমকালকে বলেন, প্রতারণায় অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম শরীফ দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। সম্প্রতি তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। পরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্ত সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে বিদেশে চাকরির জন্য চেষ্টা চালাতে গিয়ে প্রতারকের খপ্পরে পড়েন নারায়ণগঞ্জ বিআইএমটি থেকে পাস করা আট ছাত্র। চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে তারা সাইফুল ইসলাম শরীফের অফিসে গিয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তি অনুযায়ী প্রত্যেককে থাইল্যান্ডের 'সিনস্টার' নামে এক নৌ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান থেকে 'সিবিসি ট্রেনিং' ও 'এনওসি সার্টিফিকেট' পাওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। এরপর তাদের চাকরি দেওয়া হবে নরওয়ের জাহাজে। এজন্য বিদেশে যাওয়ার আগে

প্রত্যেককে তিন লাখ এবং পরে আরও ৫০ হাজার টাকা করে দিতে হবে। চাকরিপ্রত্যাশীরা সব শর্ত মেনে নেন। ব্যাংকের মাধ্যমে ১১ লাখ ৫০ হাজার ও নগদ দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন তারা। কিন্তু তার পরই ছলচাতুরি শুরু করেন শরীফ। একপর্যায়ে তিনি জানিয়ে দেন, কাউকে বিদেশে পাঠাতে পারবেন না। টাকা ফেরত দিতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান। ২০১৪ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী প্রকৌশলীদের শিক্ষক প্রেমাংশু বিকাশ দাস।

বিআইএমটির শিক্ষক প্রেমাংশু বিকাশ দাস জানান, ছাত্রদের অনুরোধে তিনি ঢাকায় এসে ভিসা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম শরীফের সঙ্গে কথা বলেন। বারিধারা জে-ব্লকের ২/৬ নম্বর সড়কের সাত নম্বর ভবনের দুটি তলায় প্রায় আট হাজার বর্গফুটের বিশাল অফিস। তার সঙ্গে দেখা করতে কয়েক ধাপের নিরাপত্তা পেরিয়ে যেতে হয়। সব মিলিয়ে শরীফকে তার বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হয়েছিল। কয়েকদিন পর ছাত্রদের অভিভাবক হিসেবে তিনি শরীফকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা দেন। এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল। তবে টাকা পাওয়ার পরই শুরু হয় টালবাহানা। অনেক চেষ্টা করেও ছাত্রদের চাকরি বা টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা যায়নি। তখন ছাত্ররা প্রেমাংশুকেই চাপ দিতে শুরু করেন। কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের ১২ লাখ টাকা ছাত্রদের দেন। আর মামলা করেন শরীফের বিরুদ্ধে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, তদন্তে বাদীর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। শরীফকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, প্রতারণার কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে ঝামেলা হওয়ায় তিনি ছাত্রদের বিদেশে পাঠাতে পারেননি।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, শরীফের বিরুদ্ধে এমন প্রতারণার অভিযোগ নতুন নয়। প্রতারিত অন্তত ১৫ জনের কথা জানা গেছে। তার ফাঁদে পড়ে টাকা খোয়ানো আরও লোক আছে বলেও তথ্য মিলেছে। শরীফের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি মামলা ও একটি অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় তার ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়।



মন্তব্য করুন