দিল্লি থেকে ফিরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

রাখাইনে 'সেফ জোন' করার প্রস্তাব ভারতকে

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতকে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়েও ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। ভারতে তিন দিনের দ্বিপক্ষীয় সফর শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। দেশে ফেরার আগে গত শুক্রবার রাতে দিল্লিতে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের নতুন প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেন। আর গতকাল শনিবার বিকেলে দেশে ফিরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তিসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যা সমাধানের বিষয়ে সন্তোষজনক আলাপ হয়েছে। শিগগিরই তিস্তা চুক্তি হবে বলে আশাবাদী তিনি। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারতের সহযোগিতা  চেয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি ভারত যান আব্দুল মোমেন। ৭ ফেব্রুয়ারি তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শক কমিশনের সভায় বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। সফরকালে তিনি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

দিল্লিতে শুক্রবার রাতে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেখানে উপস্থিত একজন সাংবাদিক সমকালকে বলেন, আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের কাছে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এ প্রস্তাবে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য 'সেফ জোন' বা 'নিরাপদ এলাকা' প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এই সেফ জোনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ বসবাস এবং জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থাসহ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি তদারকির দায়িত্বে থাকবে ভারত ও চীনসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো। ভারতের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব দেওয়া হলে মিয়ানমার তা অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখবে। তিনি জানান, এ প্রস্তাবকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি 'ইনোভেটিভ' বা নতুন উদ্ভাবন হিসেবে মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশ প্রস্তাবটি মিয়ানমারকে দিতে পারে কি-না, তা নিয়ে আলোচনা করেন সুষমা স্বরাজ। জবাবে তিনি জানান, প্রস্তাবটি ভারতের কাছ থেকে গেলে বেশি গুরুত্ব পাবে এবং মিয়ানমারের এ প্রস্তাব মেনে নেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়বে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লির সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গা সংকটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও মানবিক সিদ্ধান্ত বিশ্বের বড় বড় নেতাদের এক অর্থে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কারণ, ২০১৭ সালের আগস্টে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে না দিলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাখাইনেই সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনা ঘটতে পারত। তিনি বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান চিত্রের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেছেন, সংকট দীর্ঘ হলে এর বিরূপ প্রভাব হিসেবে রোহিঙ্গাদের মধ্যে চরমপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এর ফলে এ অঞ্চলের নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি হতে পারে। এ আশঙ্কা বিবেচনায় রেখে শিগগিরই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান দরকার। আর স্থায়ী সমাধানের পথ হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিজেদের দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী 'সেফ জোন' প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিরাপদ প্রত্যাবাসন সম্ভব বলেও এর সপক্ষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যুক্তি তুলে ধরেন তিনি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।

দিল্লির সাংবাদিকদের আব্দুল মোমেন আরও বলেন, জেসিসির সভায় তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সমস্যা শিগগিরই নিষ্পত্তি করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ব্যাপারে আলোচনা করে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের বিশেষজ্ঞরা করণীয় ঠিক করবেন।

গতকাল বিকেল ৪টার পর দিল্লি থেকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন। ভিআইপি লাউঞ্জে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, ভারত সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশই ভারতের কাছে প্রথম দেশ বলে জানিয়েছেন তারা। এ সফরের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের অধিকতর সহযোগিতা পাওয়ার প্রতিশ্রুতিও এসেছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়ে খুবই আন্তরিকতা দেখিয়েছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও জোর দিয়ে জানিয়েছেন তারা। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মানমোহন সিং যে সম্মান দিয়েছেন, আলোচনায় যে অকৃত্রিম আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তা এ সফরকে আরও মহিমান্বিত করেছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত দশ বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন, সমুদ্র সীমানা জটিলতা নিরসনের মতো বড় সাফল্য এসেছে। এর আগে ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তি সম্পন্ন করার সাফল্য দেখিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাফল্য আসবেই। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় যেসব বিষয় আছে, তারও সফল সমাধান হবে।