ঢাকা শিশু হাসপাতাল

পরিচালক পদ নিয়ে দ্বন্দ্ব বিবাদের শঙ্কা

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

রাজবংশী রায়

ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরিচালক পদে নিয়োগ নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে এখন চিকিৎসকরা। হাসপাতাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত একটি অংশ বর্তমান ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সাফি আহমেদ মোয়াজের পক্ষে, অন্য একটি অংশ অবস্থান নিয়েছে অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে। এতে করে এই হাসপাতালটিতে দ্বন্দ্ব-বিবাদ চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হাসপাতালের চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের একটি অংশ ডা. মোয়াজকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে চায়। অপর একটি অংশ এই পদে চাইছে ডা. জাহাঙ্গীরকে। তিনি হাসপাতাল শাখা স্বাচিপের সহসভাপতি। এ কারণে স্বাচিপ নেতারা অবস্থান নিয়েছেন তার পক্ষে।

ডা. জাহাঙ্গীরপন্থিরা অভিযোগ করে বলেছেন, ডা. সাফি আহমেদ মোয়াজ জ্যেষ্ঠতা ও গবেষণা কাজের তথ্য গোপন করে একাডেমিক পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালের ১ নভেম্বর ঢাকা শিশু হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ১৯৯৪ সালের ৩০ জুন ওই হাসপাতাল থেকে চাকরি ছেড়ে যোগদান করেন সিলেটের রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। প্রায় ১৬ বছর সেখানে চাকরি করার পর ২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শিশু হাসপাতালে

সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন আবারও। অন্যদিকে পরিচালক পদপ্রত্যাশী ডা. জাহাঙ্গীর আলম ১৯৯৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকা শিশু হাসপাতালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। একই হাসপাতালে তিনি পর্যায়ক্রমে মেডিকেল অফিসার থেকে পদোন্নতি পান অধ্যাপক পদে। কিন্তু একাডেমিক পরিচালক হিসেবে নিয়োগের সময় ১৬ বছর রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে চাকরি করার বিষয়টি গোপন করেন ডা. মোয়াজ। এ কারণে তিনি জ্যেষ্ঠতায় এগিয়ে ছিলেন। ডা. মোয়াজের আন্তর্জাতিক পাঁচটি এবং জাতীয় ২১টি গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। অপরদিকে ডা. জাহাঙ্গীরের কোনো গবেষণা প্রবন্ধই নেই বলে উপস্থাপন করা হয়। ডা. জাহাঙ্গীর বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, 'আমার আন্তর্জাতিক ২০টি এবং জাতীয় অর্ধশতাধিক গবেষণা প্রবন্ধ রয়েছে। হাসপাতালের সহকর্মীরা এবং ব্যবস্থাপনা বোর্ডও এ সম্পর্কে অবহিত। এর পরও গবেষণা প্রবন্ধের তথ্যটি গোপন করার ঘটনা দুঃখজনক।' তিনি অভিযোগ করেন, তৎকালীন কর্তৃপক্ষ তার গবেষণাপত্র ও যোগদানের তারিখ সঠিকভাবে বোর্ডে উপস্থাপন করেনি। সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হলে তিনি ডা. মোয়াজের জ্যেষ্ঠ হতেন।

হাসপাতালের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ডা. মোয়াজ ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েই জামায়াতপন্থি অ্যানেসথেসিয়া বিভাগের অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলামকে গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর এক্সটেনশন প্রদান করেন। এর আগে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ড ওই বছরের ২৮ নভেম্বর এক সভায় তাকে এক্সটেনশন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ডা. মোয়াজ দায়িত্ব নেওয়ার পরই বোর্ডকে অন্ধকারে রেখে ওই চিকিৎসককে এক্সটেনশন প্রদান করেন বলে অভিযোগ ওঠে। ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের বিএনপি-জামায়াতপন্থিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে স্বাচিপ চিকিৎসক নেতারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়ন পান এই হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আব্দুল আজিজ। মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের কাছে গত বছরের ২৭ নভেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৭ দিন ছুটির আবেদন করেন। বোর্ড তার ওই ছুটি মঞ্জুর করে ডা. সাফি আহমেদ মোয়াজকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেয়। নির্বাচনে ডা. আব্দুল আজিজ জয়ী হন। এরপর তিনি পরিচালক পদে যোগদান করে অব্যাহতি নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন তাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। এমনকি ডা. আজিজের যোগদান তারিখের আগেই ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মোয়াজকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের আদেশ দেন।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ডা. আজিজ অনুসারীরা ওই আদেশের বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি। ডা. আজিজ শিশু হাসপাতাল শাখা স্বাচিপের সভাপতি। আওয়ামীপন্থি সব চিকিৎসক তার অনুসারী। কিন্তু ডা. মোয়াজ বোর্ড সভাপতির আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। এ কারণে তিনি তথ্য গোপন করে হাসপাতালটির একাডেমিক পরিচালকের পদ বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন। বোর্ড সভাপতির হাত ধরেই তিনি হাসপাতালটির পরিচালক পদে নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। একইসঙ্গে তার অনুসারী অধ্যাপক ডা. ফরিদ উদ্দিন নামে একজনকে একাডেমিক পরিচালকের পদে বসানোর চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি বোর্ড মনোনীত সার্চ কমিটি পরিচালক ও একাডেমিক পরিচালক পদে প্রস্তাব করেছে এই দু'জনের নাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ সাফি আহমেদ মোয়াজ সমকালকে জানান, তার বিরুদ্ধে তথ্য গোপন করার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সত্য নয়। একইসঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. মোয়াজ বলেন, '১৯৯৪ সালে বিএনপি আমলে আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এ কারণে চাকরি ছেড়ে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজে যোগদান করি আমি।'

রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজের মালিকের বিরুদ্ধে জামায়াত-সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, তা জানার পরও ওই হাসপাতালে তার চাকরি প্রসঙ্গে প্রশ্নের জবাবে ডা. মোয়াজ বলেন, 'এটি একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ। সব ডাক্তারের প্রতিষ্ঠান। এটি খোঁড়া যুক্তি। সেটি জামায়াতের লোকজনের প্রতিষ্ঠান কি-না, আপনি খবর নিয়ে জানতে পারেন।'

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা শিশু হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভাপতি অধ্যাপক ডা. শাহলা খাতুন সমকালকে বলেন, 'শতভাগ সঠিকভাবে কাজ করা কঠিন। তবে ব্যবস্থাপনা বোর্ডে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা আছেন। আমি সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সবার সিদ্ধান্ত মেনেই কাজ করার চেষ্টা করি।'

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, 'ঢাকা শিশু হাসপাতালের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই আমি। খোঁজ-খবর নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে পারব।'