একুশের স্মৃতি-১০

প্রাণের দাবি মেলে ধরা ২০ পৃষ্ঠা

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

দীপন নন্দী

প্রাণের দাবি মেলে ধরা ২০ পৃষ্ঠা

তমদ্দুন মজলিস প্রকাশিত সেই সংকলনের প্রচ্ছদ- সংগৃহীত

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১৭ দিনের মাথায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিস। অবশ্য পাকিস্তান হওয়ার আগেই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বিতর্ক দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে প্রকাশিত 'পাকিস্তানের রাষ্ট্র-ভাষা :বাংলা- না উর্দু?' শীর্ষক পুস্তিকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সুচিন্তিত মত তুলে ধরা হয়। সামনের ও পেছনের প্রচ্ছদসহ ২০ পৃষ্ঠার এ সংকলনটিই ছিল রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা। পুস্তিকাটির লেখাগুলো এখন বিভিন্ন বই বা সংকলনে মুদ্রিত আকারে পাওয়া গেলেও মূল সংকলনটি দুষ্প্রাপ্য।

তমদ্দুন মজলিসের প্রচার বিভাগের পক্ষে এ পুস্তিকাটির প্রকাশক ছিলেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক এম এ কাসেম। এর মূল্য ছিল তিন আনা। বইটির প্রিন্টার্স লাইনে লেখা ছিল- 'প্রকাশক : অধ্যাপক এম এ কাসেম, তমদ্দুন মজলিস, রমনা, ঢাকা, প্রিন্টার : এ এইচ সৈয়দ, বলিয়াদী প্রিন্টিং ওয়ার্কস, ১৩৭ নং বংশাল রোড, ঢাকা। ১ম সংস্করণ : সেপ্টেম্বর ১৯৪৭, দাম- তিন আনা।'

'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা- না উর্দু' পুস্তিকাটিতে তিনটি নিবন্ধ স্থান পেয়েছিল। এগুলোর মধ্যে তমদ্দুন মজলিসের  পক্ষে 'আমাদের প্রস্তাব' প্রবন্ধটি লেখেন অধ্যাপক আবুল কাসেম। এতে ভাষা বিষয়ে সংগঠনটির মৌলিক অবস্থান তুলে ধরা হয়। এ নিবন্ধে আবুল কাসেম লেখেন, "বাংলা ভাষাই হবে- পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালতের ভাষা ও অফিসাদির ভাষা। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হবে দু'টি- উর্দু ও বাংলা।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক কাজী মোতাহের হোসেনের নিবন্ধের শিরোনাম ছিল 'রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা-সমস্যা'। দীর্ঘ রচনাটি পরে 'সওগাত' পত্রিকার ১৯৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যায়ও প্রকাশ হয়েছিল। এতে তিনি লেখেন, 'কোনো দেশের লোকে যে ভাষায় কথা বলে, সেইটাই সে দেশের স্বাভাবিক ভাষা। প্রজা সাধারণের ভাষাই রাষ্ট্রভাষা। অতএব পূর্ব পাকিস্তানের রাজভাষা বা রাষ্ট্রভাষা বাংলাই হওয়া স্বাভাবিক এবং সমীচীন।'

এ ছাড়া তৎকালীন দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদের 'বাংলা ভাষাই হইবে আমাদের রাষ্ট্রভাষা' নিবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সাতটি যুক্তি তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত প্রথম এ পুস্তিকা সম্পর্কে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সমকালকে বলেন, 'এটি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।' পরে ১৯৫২ সালে যুবলীগের উদ্যোগে প্রকাশিত হয় রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত আরও একটি পুস্তিকা 'রাষ্ট্রভাষা কী ও কেন?' সময়াভাবে মোহাম্মদ তোয়াহা লিখতে পারছিলেন না বলে এটি তখন লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয় আনিসুজ্জামানের ওপর- যার বয়স ছিল তখন মাত্র ১৫ বছর।

এক সময় প্রথম পুস্তিকা প্রকাশের দিনটিকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের 'ঘোষণা দিবস' হিসেবে পালন করা হতো। ২০০৩ সালে এক যুক্ত বিবৃতিতে দেশের ছয়জন বরেণ্য ব্যক্তি স্মৃতিবিজড়িত ১৫ সেপ্টেম্বরকে ভাষা আন্দোলনের ঘোষণাপত্র প্রকাশ দিবস হিসেবে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। এ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন জাতীয় অধ্যাপক ড. ইন্নাস আলী, কবি শামসুর রাহমান, ড. আনিসুজ্জামান, গাজীউল হক, আবদুল মতিন ও আবদুল গফুর।'

বিবৃতিতে তারা বলেন, 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সূচনায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে ভাষা আন্দোলন সংগঠনের দিকনির্দেশনা সংবলিত প্রথম পুস্তক 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা- না উর্দু' প্রকাশিত হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র এক মাসের মাথায় ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তারিখে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি মেনে নেয়া না হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুস্পষ্ট সম্ভাবনার কথা প্রথম এ পুস্তিকাতেই উল্লেখ করা হয়েছিল।' বিবৃতিতে তারা আরও বলেন, 'জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আজ বিস্মৃত হতে চলেছে।'