একুশে বইমেলা

সকালটা শিশুদের বিকেলটা সবার

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

সকালটা শিশুদের বিকেলটা সবার

শনিবার বইমেলায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের অটোগ্রাফ নিতে ভিড় করে শিশুরা ফোকাস বাংলা

ভিড় ছিল না আগের দিনের মতো। তবে যা ছিল, তার সবই প্রায় ক্রেতা। এ ক্রেতাদের খুদে অংশ সকালটা করে নিয়েছিল নিজেদের আর বিকেলটা ছিল সব বয়সীর। দুই সময়েই ছিল দুই অংশের পদচারণায় মুখর। মেলার তৃতীয় শিশুপ্রহরে শিশুদের উচ্ছ্বাসে মাখা ছিল গতকাল শনিবারের সকাল। আর বিকেল থেকে রাত অব্দি সব বয়সী পাঠক ঘুরে ফিরেছেন মেলামাঠ, কিনেছেন নতুন বই।

আগেই ঘোষণা ছিল শিশুপ্রহরের। সেই অনুযায়ী সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত  বাবা-মায়ের হাত ধরে মেলায় এসেছিল খুদে পাঠকরা। বরাবরের মতো তাদের জন্য শিশুচত্বরের সিসিমপুর মঞ্চে ছিল সিসিমপুরের চরিত্ররা। হালুম, টুকটুকি, ইকরি আর সিকুদের সঙ্গে নেচে-গেয়ে শিক্ষামূলক নানা তথ্য জানতে পারে তারা।

তবে শিশুপ্রহরে আগতদের সবচেয়ে বড় পাওনা ছিলেন জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। গতকাল এবারের মেলায় দ্বিতীয়বারের মতো এসেছিলেন তিনি। শিশুদের অটোগ্রাফ দিয়ে ও তাদের সঙ্গে ছবি তোলার আবদার মিটিয়েছেন তিনি। এরই ফাঁকে তিনি বলেন, 'শিশুরা এখন কম্পিউটার, মোবাইলের স্ট্ক্রিনে আকৃষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য মূল ভূমিকা রাখতে হবে অভিভাবক ও শিক্ষকদের। তাদের শ্রেণিকক্ষের পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা করার সুযোগ করে দিতে হবে। সেইসঙ্গে বই পড়ারও সুযোগ করে দিতে হবে।'

শিশুপ্রহরে আরও এসেছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। তিনি বাংলা ভাষায় অনূদিত পরমাণুশক্তি বিষয়ক তিনটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।

শিশুপ্রহর শেষে মেলা কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। তবে বিকেল ৪টার পর মেলায় আসতে শুরু করেন পাঠকরা। সন্ধ্যা নাগাদ ভিড় জমে যায় মেলায়। এরই মাঝে আব্দুল মান্নান শিকদারের কাব্যগ্রন্থ 'সুন্দর খেলা করে'র মোড়ক উন্মোচন করতে এসেছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর।

অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে দাঁড়িয়ে বিভিন্নজনের বইয়ে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন তিনি। কথা হলো তার বই প্রকাশ হওয়া নিয়ে। হেসে বললেন, 'আমি তো ভাই লেখক না'। এরপর বললেন, তার জীবনে সৌভাগ্য হয়েছিল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনের সঙ্গে সময় কাটানোর। অনেক কিছু জানা ও শেখার ছিল সেই সময়গুলোতে। সেইসঙ্গে গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, রাজনীতিতে যোগদান, সাংসদ নির্বাচিত ও মন্ত্রী হওয়া। এসব স্মৃতিময় ঘটনাকে তিনি বইয়ের পাতায় তুলে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বলেও জানালেন।

লেখক বলছি... মঞ্চ :গতকাল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে 'লেখক বলছি...' মঞ্চে গতকাল নিজেদের সাহিত্যকর্ম বিষয়ে আলাপনে অংশ নেন কবি মারুফ রায়হান (হাওয়া নগরের পারুল ফুল), কবি ও প্রাবন্ধিক কুমার চক্রবর্তী (কবিতা সংগ্রহ), কবি মাহবুব সাদিক (নির্বাচিত কবিতা), কবি-কথাসাহিত্যিক মাহবুব আজীজ (এইসব কলহাস্য) এবং কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান (নদীধারা আবাসিক)।

নতুন বই :বাংলা একাডেমির জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় নতুন ২১৮টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ৪৪, উপন্যাস ৩২, প্রবন্ধ ১২, কবিতা ৬৪, গবেষণা ৫, ছড়া ৪, শিশুসাহিত্য ৮, জীবনী ৯, মুক্তিযুদ্ধ ৫, নাটক ৪, বিজ্ঞান ৩, ভ্রমণ ২, ইতিহাস ৩, রাজনীতি ১, স্বাস্থ্য ৩, রম্য/ধাঁধাঁ ২, ধর্মীয় ১, অনুবাদ ১, সায়েন্স ফিকশন ১ এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর এসেছে ১৪টি নতুন বই।

এর মধ্যে রয়েছে ফরিদুর রেজা সাগরের 'এবারো হাফ ডজন ছোটকাকু' ও গোলাম কুদ্দুছের 'ভাষা আন্দোলন সহজ পাঠ' (অন্যপ্রকাশ), তারেক শামসুর রেহমানের 'দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি' (শোভাপ্রকাশ), মশিউল আলমের 'বাংলাদেশ ও অন্যান্য গল্প' (মাওলা ব্রাদার্স), ওবায়দুল কাদেরের 'বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য' (অন্বেষা), শহীদুলল্গাহ কায়সারের 'সংশপ্তক' অবলম্বনে নাজমা জেসমিন চৌধুরীর 'কিশোর সংশপ্তক' (জয়তী), জাকির তালুকদারের 'গল্পের জার্নাল' ও সৈয়দ শামসুল হকের 'কানার হাটবাজার ও অন্যান্য' (ঐতিহ্য)। এ ছাড়া নতুন বইয়ের মধ্যে রয়েছে যতীন সরকারের 'গল্পে গল্পে ব্যাকরণ' (আলোঘর), নঈম নিজামের 'অন্ধকার জগতের কাহিনি' (অন্বেষা), এ কে এম শাহনাওয়াজের '৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল' (প্রতীক) ও মাহমুদ নোমানের 'লুইজালে' (পরিবার পাবলিকেশন্স)।

মূল মঞ্চের আয়োজন :গতকাল গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় 'আবদুল হক :জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সৈয়দ আজিজুল হক। আলোচনায় অংশ নেন সমকালের উপসম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত, কবি-সাংবাদিক সোহরাব হাসান এবং প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুব্রত বড়ূয়া।

সৈয়দ আজিজুল হক বলেন, 'আবদুল হক বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ঘটনা- ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে অগ্রণী, দূরদর্শী ও দায়িত্বশীল চিন্তকের পরিচয় দিয়েছেন।

অজয় দাশগুপ্ত বলেন, 'বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- উভয় ক্ষেত্রেই আবদুল হক প্রদর্শন করেছেন বুদ্ধিজীবীর দায়বোধের চূড়ান্ত আদর্শ। তার চিন্তার স্বচ্ছতা, দূরদর্শিতা ও দেশপ্রেমের উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হয়ে আছে এ বিষয়ক প্রবন্ধাবলিতে।

সুব্রত বড়ূয়া বলেন, 'আবদুল হক একজন সত্যসন্ধ বুদ্ধিজীবী। তার নাট্য রচনা, অনুবাদ, দিনলিপি, প্রবন্ধ গবেষণা- সবকিছুর মধ্যেই বড় করে প্রতিভাত হয়েছে দেশপ্রেম, উদার মানবিকতা এবং নিরাপোস মনোভাব।'

সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পর্বে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি আতাহার খান এবং ফরিদ কবির। আবৃত্তি পরিবেশন করেন বেলায়েত হোসেন এবং অনন্যা লাবণী পুতুল। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল গোলাম কুদ্দুছের পরিচালনায় বহ্নিশিখা এবং খাজা সালাহ উদ্দিনের পরিচালনায় নৃত্যসংগঠন ঘুংঘুর সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিবেশনা।

আজকের আয়োজন :আজ রোববার গ্রন্থমেলার দশম দিনে মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে 'কথাশিল্পী অমিয়ভূষণ মজুমদার :জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন মহিবুল আজিজ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন হোসেনউদ্দীন হোসেন, মাহবুব সাদিক এবং হরিশংকর জলদাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সেলিনা হোসেন। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ, কবিতা-আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।